Saturday, July 18, 2020

করোনা মহামারী থেকে শিক্ষা - মেসেঞ্জার অব কসমোলজি সম্পাদিত।

মতামত


ছবি : মেসেঞ্জার অব কসমোলজি



সংকট এলেই উন্মোচিত হয় চারিত্রিক বাইবেল। বৌদ্ধিক চোখের ভাঁজ যদি না খোলে তবে তো সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। মতাদর্শিক আশ্রয় হিসেবে কম্যুনিজম এখন ছিন্ন ভিন্ন ভেলা। বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন পরবর্তী সময়ে আর কোন প্রদীপ যেন বিশ্ববাসী দেখলোই না। আর বৈশ্বিক কাঠামোগত অসাড়তার কথা জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান থেকে শুরু করে সমকালীন সব চিন্তাবিদ, দার্শনিকের মধ্য দিয়েই উঠে এসেছে। বৈশ্বিক নেতৃত্ব সংকটের কথাও রিপিট হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শংকা হয়ে জেগে থাকা জলবায়ুর ত্রাস, খুব সম্ভব সে পথ ধরেই করোনা সংকট গোটা বিশ্বের জন্য তীব্রতা ও ব্যাপ্তিতে আরও নতুন। প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক আলগা করে, মুনাফা কেন্দ্রীক অর্থনীতির লাগামহীন বেলেল্লাপনা প্রতিযোগিতায় মেতে সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, অন্ধকার তরল হচ্ছে।

গলিত অন্ধকারের বুক চিড়ে, ইস্পাত-দৃঢ় সংকটের বেষ্টনী ভেঙে ভোর উঠাবার দায় মানুষেরই। "মেসেঞ্জার অব কসমোলজি" এবার মুখোমুখি হলো কয়েকজন চিন্তাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, কমরেডের সাথে। এ শুধু বিশ্লেষণ নয়, আকাঙ্খা আর আকুতি নয়, নয় ভাড়াটে কলম নিঃসৃত কথা, এটা কথা, স্বপ্ন, এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের তীব্র প্রচেষ্টা। শুধু মুখ নয়, বুক দিয়েও আমরা আশা রাখি, চেষ্টা করি মানবিক মানচিত্র প্রতিষ্ঠার।

নিয়মিত আমাদের সাথে থাকুন। পড়ুন। আপনিও লিখুন। এ পর্বে "করোনা মহামারী থেকে শিক্ষা" শীর্ষক মতামত সমূহ পড়ুন। ধন্যবাদ। 

সম্পাদকীয়।

বিজ্ঞানেই অবলম্বন, ল্যাবরেটরিতেই আস্থা - এম ইকবাল।

কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ



    এই সময়ে পৃথিবীতে হতে পারতো তৃতীয় কোনো বিশ্বযুদ্ধ, যেটা অনেকদিন ধরেই অনেক বুদ্ধিজীবীদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, যদিও বিশ্বজুড়ে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। এছাড়াও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া, ভারত-(কাস্মীর)পাকিস্থান, হিন্দু- মুসলিম, (ভারত- NRC, CAA), রোহিঙ্গা নিধন(মিয়ানমার), নির্বাচন ও নেতৃত্বের পালাবদল এবং আরও অসংখ্য রাজনৈতিক ইস্যুকে ঘিরে সারা পৃথিবীজুড়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাধারন মানুষ থেকে রাষ্ট্রীয় কর্নধার পর্যন্ত সবার মাঝেই এক ভয়াবহ অস্থিরতা কাজ করছে। সেক্ষেত্রে বিশ্বযুদ্ধ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো নিঃসন্দেহে। যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন অনিবার্য ফল হিসেবে পরবর্তী প্রজন্ম পরম্পরাগতভাবে প্রাপ্ত শত্রুতা লালন করে বেড়ে উঠত। ফলে পরবর্তী আরেকটা যুদ্ধের সম্ভাবনা থেকেই যেত।

    এক্ষেত্রে করোনা ভাইরাস সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। মানুষে মানুষে শত্রুতার বদলে পৃথিবীর মানুষের সামনে নতুন চ্যালেন্জ ছুড়ে দিয়েছে। এতে মানুষ তার অসহায়তা এবং ক্ষমতার সীমাটাকে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছে। সেই সাথে যতো সময় যাবে এই উপলব্ধিটা ততোই স্পষ্ট হবে।

এটা আমার কথা নয়।
বিগত পৃথিবীর ইতিহাস এটাই বলে।

যতক্ষণ মানুষের সামনে মানুষ ব্যতীত অন্য কোন বিপদজনক শত্রু অনুপস্থিত ছিলো ততক্ষণ মানুষের মাঝেই বিভেদ ছিলো, মানুষই মানুষের শত্রু ছিলো। যখনই মানুষের সামনে তৃতীয় কোন বিপদজনক শত্রু এসে উপস্থিত হয়েছে তখনই মানুষের মাঝে বিভেদের পরিবর্তে ঐক্যতা এসেছে।

তাহলে কি মানুষে মানুষে ঐক্যতার প্রশ্নে তৃতীয় কোন শত্রু অনিবার্য?

সম্ভবত না, অনিবার্য না। ওটা বিগত পৃথিবীর ইতিহাস। এখানেই পৃথিবীতে বড় একটা পার্থক্য ঘটে যাচ্ছে। আগামী পৃথিবীতে মানুষে মানুষে ঐক্যতার কারন হিসেবে তৃতীয় কোন শত্রুর প্রয়োজন পড়বে না। মানুষের নির্বুদ্ধিতার দিন শেষ হয়ে বোধের উন্মেষ ঘটতে যাচ্ছে। এখানেই মানুষ নতুন যুগের শুরু করতে যাচ্ছে।

এই মহামারী থেকে আমরা আসলে কি কি শিক্ষা পেতে পারি?

১. পৃথিবীজুড়ে বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বর্তমান চ্যালেন্জ মোকাবেলায় কতটা অসাড় তা দেখিয়ে দিয়েছে এই করোনা মহামারী। সেই সাথে সুষ্ঠু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা কতটা জরুরী সেটাও এই জরুরী অবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

২. স্রষ্টাবিশ্বাস মানুষের আত্ববিশ্বাসকে বৃদ্ধি করে এবং মানুষের মানসিক অস্থিরতা সাময়িক ভাবে দূর করে। জীবন ও যাপনের প্রয়োজনে মানুষ শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানকেই অবলম্বন করে এবং ল্যাবরেটরিতেই আস্থা রাখে।

মানুষ এখনো মুলত প্রকৃতির উপরই নির্ভরশীল - মুরশীদ সেলিন।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিশ্লেষক


পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। বাইরে থেকে এসে হাত মুখ ভাল করে ধুতে হবে। হাত না ধুয়ে কোনকিছু খাওয়া যাবে না। বাইরের খোলা খাবার খাওয়া উচিত না। স্বাস্থবিধির এসকল প্রাথমিক শিক্ষা আমার শৈশবেই পেয়ে থাকি এবং তা অনেকটা মুখেমুখেই। কিন্তু ব্যস্ত জীবনের নিরন্তর ছুটে চলার ঘোরে অনেক সময়ই তার চর্চা ভুলে যাই। করোনা আমাদের সেই শিক্ষাটা স্মরন করিয়ে দিয়েছে।

পুঁজিবাদী চিকিৎসা ব্যবসার ঝলকানিতে যে বিষয়টি আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম তা হচ্ছে বেশীরভাগ জীবানুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখনো মানুষের একমাত্র সম্বল আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। বিশেষ করে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ঔষধ চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থকর ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহন, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও অভ্যাস পরিহার করা ইত্যাকার বিষয়গুলো আমাদের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা যা সকলেই পেয়েছে। করোনা এসে বুঝিয়ে দিলো যে বিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্বেও বেঁচে থাকার জন্য মানুষ এখনো মুলত প্রকৃতির উপরই নির্ভরশীল।

হাজার হাজার বছরের অভিজ্ঞতা লব্ধ মানব সভ্যতার স্বতসিদ্ধ যে সাধারন জ্ঞান, আধুনিকতার নামে আমরা তা যেন ভুলে না যাই। করোনা মহামারী থেকে এটি হতে পারে একটি যথার্থ শিক্ষা।

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে - একেএম খাদেমুল বাশার


লেখক ও পর্যটক


‘জীবন নামের রেলগাড়িটা পায়না খুঁজে স্টিশন।‘ এই লাইনটা আজ ভীষণ মনে পড়ছে। মনে পড়বেই না কেন বলুন, করোনাকালীন এই সময়ে এই লাইনটাই যে বাস্তব সত্য। এই সময়ে মানুষ বুঝেছে, যে ইট-পাথরের শহরকে তারা আপন করতে চেয়েছিল তা শুধুই মিছে অভিনয়ই ছিল। শহরের দাম্ভিকতা, একে অপরের থেকে একধাপ এগিয়ে থাকার মিথ্যে প্রতিযোগিতা, মানুষের রোবট হয়ে থাকা, প্রকৃতির সাথে অমানবিক অত্যাচার সহ আরো কতো কি না মানুষ করেছে। একটা বারও মানুষ নিজেকে নিয়ে ভাবেনি।

করোনা বুঝিয়ে দিয়েছে এই শহরের মানুষের সবকিছু ভুল ছিল। এখন প্রকৃতি তার আপন মনে সেজেছে আর মানুষ নিজেকে নিয়েই শঙ্কায়। নিজের জীবন বাঁচানো নিয়ে কতো ব্যস্ত মানবজাতি। বিত্তবানরা ঘরের কোণে থেকে দিন পার করলেও নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের টিকে থাকার আর্তনাদ চোখের কোণে অবলীলায় জল এনে দিতে বাধ্য।

হায়রে মানুষ, রঙ্গিন ফানুস। যাদের দম ফুরালেই ঠুস তারা কেনো এতো স্বার্থপর নিজেদের টিকে থাকার জন্য। কেন এতো নিষ্ঠুর নিজেকে আরেকজনের থেকে উঁচুতে নিয়ে যেতে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কি একটা মানুষ চলতে পারেনা?

করোনা এসব কিছুর সমাধান এনে দিয়েছে। পারিবারিক কলহ দূর করে একত্র হয়ে যৌথভাবে কিভাবে থাকা যায় তা শিখিয়েছে। শহুরে কালচার যে সেরা কালচার নয়, শহুরে জীবনই যে সেরা জীবন নয় তা শিখিয়েছে। মা-মাটি ও প্রকৃতির সাথে মিশে থাকার যে আকুলতা, ব্যাকুলতা তা বুঝতে শিখিয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য এটা বুঝতে শিখিয়েছে। ধনী-গরীব এক হলে দেশে যে অন্য এক আবহ তৈরি হয় সেটা বুঝিয়েছে করোনা।

এই করোনা থেকে যে আসল শিক্ষাটা পেয়েছি তা হলো বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃকোড়ে। এদেরকে এদের মতো করে বেড়ে উঠতে দিন দেখবেন পৃথিবী বদলে যাবে। আপনি আমি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এদের বিপর্যয় না করলেই  পৃথিবী সুন্দর হয়ে যাবে।


গোলাবারুদ নয় গোলাপ চাই  - মিঞা ভাই


কলামিস্ট ও স্টুডেন্ট লিডার


আমরা আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে অর্থ, সৈন্য বাহিনী,  অস্ত্র ও পারমাণবিক শক্তি মজুদ করে ছিলাম। অনেকে আবার এইসবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ছিলো৷ অথচ ছোট্ট একটি ভাইরাসের কাছে এইসব মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। এত এত নিরাপত্তার বেষ্টনী, কাঁটাতার, সীমান্তরক্ষী বাহিনী থাকতেও আজকে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় গৃহবন্দী।

"নিজে ভালো থাকলেই জগৎ ভালো " আমরা যারা এই কালেমা জপে ছিলাম এদ্দিন আমরা সত্যিই ভালো আছিতো? খুব জানতে ইচ্ছে করে।
আমাদের এমন করে ভালো থাকাটাই এখন এবং পরবর্তীতে অনেক বেশি খারাপ থাকার কারণ৷

 আমরা আমাদের জীবনে সুখের জন্য যাপনে অনেকটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করি কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে একটা বিষয় স্পষ্ট যে শৃঙ্খল জীবন যাপনেই আমাদের জীবনে সুখ আসতে পারে৷

পৃথিবীটা ধ্বংস করতে এতদিন প্রয়োজন হতো না যতদিন থেকে আমরা পৃথিবীকে সুস্থ করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাই এখন সময়ের দাবী গোলাবারুদ নয় গোলাপ চাই।

পুরনো ব্যবস্থাপনাকে ভেঙ্গে নতুন করে সাজাতে হবে - মোঃ শামীম মিয়া।

কলামিস্ট ও স্টুডেন্ট লিডার


করোনা বৈশ্বিকভাবে সব কিছুই থামিয়ে দিলেও সময় তার আপন গতিতেই জীবনকে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। যোগাযোগ সহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করতে হচ্ছে প্রযুক্তির উপর ভর দিয়েই আর প্রযুক্তিই বিশ্বগ্রাম কে একসথে বেঁধে রেখেছে। করোনা মহামারিতে একটা বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝা গেছে শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রবাসীদের আয় সব কিছুই সাময়িক সময়ের জন্য সমাধান মনে হলেও কৃষি অর্থনীতিটা আমাদের চোখে জীবননীতি হিসেবেই ধরা দিয়েছে। এটাই হল আমাদের একমাত্র শ্রেষ্ঠ উত্তরণের পথ।
হতাশার ব্যপক বিস্তৃত ক্ষেত্র যেমন দেখেছি সব কিছু উপেক্ষা করে সম্ভবনার প্রচুর উর্বরতাও দেখেছি।  দানবীয় আচরণ করোনা মহামারি কে আরও ভয়াবহ রূপ দান করেছে।
কেউ সুযোগের অপব্যবহার করে এই সময়টাকে আরও দূর্বিষহ করে তুলছে। মানবীয় অবক্ষয়ের চিত্র আগে থেকে দেখে আসলেও সবার চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে এই সময়ে।
পৃথিবীর জন্য এই পুরনো ব্যবস্থাপনার অচলায়তন পথটা কত কঠিন আর শক্ত সেটা উপলব্ধি করতে এখন আর বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
সবাই যখন বিছিন্ন করার জন্য ব্যস্ত তখন সঠিকতার জন্য সচেতন তরুণরাই এগিয়ে এসে উচ্চারণ করছে সামাজিক নয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। কিছু মানুষ যখন লকডাউন এর জন্যে খুশি মনে বিশ্রাম নিচ্ছেন তখন কিছু মানুষ সামাজিক দায়িত্ব পাগলে দৃঢ়ভাবে অজানা পথ এগিয়ে চলছেন।  পুরনো ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে ভেঙ্গে সাজাতে প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের নতুন স্বপ্ন যা দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হবে আগামীর নতুন পৃথিবী।


বাঁচতে হলে সবাইকে নিয়ে একসাথে বাঁচতে হবে- আব্দুল আলীম।

কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ


মানবসভ্যতার সেই আদিকাল থেকেই মানুষ নানা ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন এবং সেখান থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখার প্রশ্নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তেমনি করোনা ভাইরাসের মতোন মরনব্যাধী শিখিয়ে দিলো মানুষের বাসযোগ্য নামক গ্রহটিতে বাস করার জন্য কী কী সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

নতুন কোন সমস্যার স্বীকার হলে বাস্তব নিষ্ঠ, বিজ্ঞান সম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমরা কতটুকু প্রস্তুত আছি সে ব্যাপারে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলো।

সংকটকালীন এ সময়ে সরকারের সমাধানিক সিদ্ধান্ত তো এমন হওয়া প্রয়োজন ছিলো যে, মেজরিটি মানুষ সুস্থও থাকবে, পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকাও সচল থাকবে।

যন্ত্রের অভিঘাতে সমাজে পরিবর্তন আসে। আর সেই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব এখন গাঁয়ের চেয়েও ছোট। কিন্তু প্রযুক্তির সুফল এখনো সকল মানুষ ভোগ করতে পারেনি। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকেও প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। এটা সম্ভব হলে করোনা প্রতিরোধে আমরা আরও সফল হতাম।

সমস্যা যেহেতু বৈশ্বিক, সেহেতু সমাধানও বৈশ্বিক ভাবে করতে হবে। কিন্তু বৈশ্বিক কোন কাঠামো না থাকার সীমাবদ্ধতা এখনো বর্তমান। পুরনো খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাঁচার জন্য একটিই পৃথিবী, বাঁচতে হলে সবাইকে নিয়ে একসাথে বাঁচতে হবে।
লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
১৮.০৭.২০২০

Friday, July 17, 2020

বেকারত্ব ও পরিবর্তনীয় ভবিষ্যতের হাতছানি - মিরান।


মিরান
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

কভিড-১৯ একটি বৈশ্বিক মহামারি। এর কারণে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। চলমান মহামারির স্থায়ীত্বের উপর নির্ভর করবে বাংলাদেশে ক্ষতির পরিমান কেমন হবে। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, উক্ত ক্ষতি আমাদের সমাজে মৌলিক ও নানামুখী পরিবর্তন নিয়ে আসবে। বিগত সময়ে আমরা যেভাবে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলাম, কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে তা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনস্বীকার্য।

কভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিবে বেকারত্ব। আমেরিকায় প্রায় ৪৩ মিলিয়ন বা ৪ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ তাদের চাকরি হারিয়েছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশেও প্রায় দেড় কোটি মানুষ তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের অনেকেই ইতিমধ্যে বেকার হয়ে পড়েছে। সরকারের নানামুখী প্রণোদনা পাওয়া সত্বেও বিজিএমইএ মোটামুটি বৃহৎ সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। এবং ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূঁজি হ্রাস হবে আরও তীব্র, তাদের অনেকেই পূঁজি হারিয়ে এখন পথে বসে গেছে। তাদেরকে কোনো সরকারি প্রণোদনাতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সম্প্রতি আমেরিকায় 'জর্জ ফ্লয়েড' হত্যার বিচারের দাবীতে বর্ণবাদ বিরোধী চলমান বিক্ষোভের সময়ে অনেক 'শো-রুম' লুটপাটের ঘটনা ছিল চোখে পড়ার মত। এ লুটেরাদের প্রায় সবাই সম্প্রতি চাকরি হারিয়েছেন, এদের অধিকাংশই কৃষ্ণাঙ্গ এবং এ লুটপাট ছিল মূলত একটি প্রতিবাদ। কৃষ্ণাঙ্গরা এ ঘটনার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ ধনীদের একটি বার্তা দিয়েছে যে, আমাদের চাকরি না থাকলে তোমাদেরকেও শান্তিতে থাকতে দিবো না। বলে রাখা ভালো, আমেরিকায় সাম্প্রতিক বেকারত্বের অন্যতম প্রধান স্বীকার কৃষ্ণাঙ্গরাই। হত্যাকান্ডের স্বীকার হওয়া জর্জ ফ্লয়েডও চাকরি হারানোদের একজন।

বাংলাদেশে যদি দেড় কোটি মানুষ নতুন করে বেকার হয়, তাহলে জীবিকা-বঞ্চিত হবে আরও ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষ। কারন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী একজনের আয়ের উপর আরও দুই থেকে তিনজনের জীবিকা নির্ভর করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে পূর্ববর্তী বেকারত্বের সংখ্যা প্রায় ২.৫ কোটি।  তার উপর দেশে প্রতিবছর নতুন করে শিক্ষিত বেকার যুক্ত হচ্ছে প্রায় ২০ লক্ষ । আর প্রবাসীদের একটি বড় সংখ্যা যদি বেকার হয়ে দেশে ফিরে আসে, আর যারা দেশে এসে আটকে আছে তারাও যদি চাকরি হারায়, তাহলে বেকারত্ব বাংলাদেশে নানামুখী সমস্যা সৃষ্টি করবে, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

সম্প্রতি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইটালিসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি নাগরিকেরা কভিড নেগেটিভের ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে ভ্রমণ করার পর পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার কারণে সারাবিশ্বে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি শ্রম-আমদানি নির্ভর বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করেছে, শর্ত সাপেক্ষে ভ্রমণের নীতি গ্রহন করেছে। ফলে যেসব প্রবাসি শ্রমিক দেশে আটকে আছে, তাদের কাজে ফিরে যাওয়াটাও পিছিয়ে গেছে, তাদের পরিবারগুলোও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

তেলের দাম 'গ্রেট-ফল' হওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এমনিতেই হুমকির মুখে, তার উপর কুয়েতে বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য (পাপুল) 'এশিয়ার মানব পাচারকারী চক্রের প্রধান হোতা' ও ব্যাপক 'অর্থ পাচারকারী' হিসেবে দেশটিতে আটক রয়েছে। এ ঘটনায় দেশটির একজন জেনারেল, কয়েকজন মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজনকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানিতে কিছু কঠোর নীতিমালা যুক্ত করার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটি। এ ঘটনায় আরব বিশে্ব তোলপাড় শুরু হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে গিয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। লকডাউনের সময়ে বিমানবন্দরগুলোতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও ঋণখেলাপী, ব্যাংক লুটেরা ও অর্থ পাচারকারীদের বিদেশ গমন আমাদেরকে চরমভাবে হতাশ করেছে। ব্যাংকগুলোতে চলছে তারল্য সংকট। চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন করে টাকা ছাপানোর কথাও ভাবছে, ফলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও অমূলক নয়। গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৬০ শতাংশ (প্রকৃতপক্ষে ১০০ শতাংশ)। গত কয়েকবছর ধরে গ্যাস, বিদ্যুৎ, ঘরভাড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবার অনবরত দাম বেড়েছে। ফলে স্থায়ী এবং সাময়িকভাবে বেকার হয়ে যাওয়া পরিবারগুলো কীভাবে চলবে, তার কোনো সমাধান নেই।

এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা তাদের জীবন-মান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। মধ্যবিত্তরা চলে যাবে নিন্ম-মধ্যবিত্তের কাতারে, নিন্ম-মধ্যবিত্ত হয়ে যাবে নিন্মবিত্ত, নিন্মবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং নিন্মবিত্তদের অনেকেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাতারে নতুন করে যুক্ত হবে। ব্র্যাকের হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের সংখ্যা প্রায় '৬ কোটি'। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক সমস্যাগুলোও ব্যপকভাবে বেড়ে যাবে বলে ধারণা করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। নিন্মবিত্তের যে মানুষেরা কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাত, আয়-রোজগার কমে যাওয়াতে এবং জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়াতে তারা ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা থেকে সরিয়ে আনবে, পরিবারের আর্থিক খরচ বহন করতে তাদেরকে নিন্ম মানের শ্রমবাজারে ঠেলে দিবে, বেড়ে যাবে শিশুশ্রম। ফলে দক্ষতা হারাবে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির বড় একটি অংশ। ফলে, একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়ে যাবে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যে তরুণেরা এতদিন শ্রম-বাজারের একটি বড় অংশ ছিল, তারা চাকরি হারিয়ে অর্থের প্রয়োজনে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনের মত অপরাধে জড়িয়ে পড়বে, হতাশায় মাদক গ্রহণ ও পর্যায়ক্রমে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হবে। বেড়ে যাবে ধর্ষণের মত অপরাধও। সংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে সমাজে তাদের প্রভাবও বাড়তে থাকবে, আর এক্ষেত্রে বড় অবদান রাখবে আমাদের সমাজে প্রচলিত তথাকথিত 'বড়ভাই সংস্কৃতি'। উক্ত 'বড়ভাই'দের হাত ধরে তারা ঢুকে যাবে অপরাধ জগতের গভীর সমুদ্রে। প্রভাব বিস্তার করতে থাকবে সমাজে। সাধারণ মানুষদের চলাফেরায় নানামুখী সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে অশিক্ষিত সর্বহারা এ তরুণগুলো। কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হবে শহুরে জীবন। সমস্যা হয়ে উঠবে দীর্ঘ-মেয়াদি।

এদিকে শিক্ষিত-সচেতন মানুষদের মধ্যে বাড়তে থাকবে জন-ক্ষোভ। তারাও বেকারত্বের স্বীকার হচ্ছে, হবে। আয়-উপার্জন কমে গিয়ে, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গিয়ে, তাদের জীবন-মান হবে নিন্মমুখী, সামাজিক ও পারিবারিক জীবন হয়ে উঠবে দুরবিসহ। চাকরি হারিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো থেকে বাসা ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। সাময়িকভাবে আর্থিক অসচ্ছলতা ও ঋণগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়ে যেতে পারে। তারা (শিক্ষিত মধ্যবিত্ত) যেহেতু বিগত সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জ্ঞাত ও সচেতন, ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী করবে। সাথে যোগ হবে সদ্য ঘটে যাওয়া কভিড-১৯ মহামারিতে স্বজন হারানোর ক্ষোভ, যদিও চলমান এ মৃত্যুর মিছিল বা সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনও অনিশ্চিত। সে 'মৃত্যুর স্বীকৃতি' সরকারি হিসাবে পাক বা না-পাক।

আমরা যদি ২০১০ পরবর্তী সময়ে 'আরব বসন্তে'র দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেকারত্ব বেড়ে গিয়েছিল ব্যপক হারে। বেকারত্বই ছিল আরব বসন্তের অন্যতম কারণ। তার সাথে যোগ হয়েছিল পূঁজি লুন্ঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যস্থাপনা, অদক্ষতা, দূর্নীতি, রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটপাট ও অপশাসন। দীর্ঘমেয়াদি পুঞ্জিভূত জনক্ষোভ 'ঘি' ঢেলেছিল উক্ত বিদ্রোহের আগুনে। ফলাফল কী হলো? দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। আর দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা হয়ে উঠল দীর্ঘস্থায়ী। বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তি দেশগুলো নিজেদের ঘরে তুলল সেই 'আরব বসন্তে'র ফসল।

কভিড-১৯ মহামারির কারণে সামনের দিনগুলোতে আরেকটি 'আরব বসন্ত' হাতছানি দিচ্ছে। তবে এবার আরবে নয়, বসন্ত আসবে দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ এবং খোদ উত্তর আমেরিকাতেই। বিশেষ করে যেসব দেশগুলোতে কভিড-১৯ ব্যাপকভাবে ক্ষয়ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার এ সময়ে অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সহযোগিতার পরিধিও কমে আসতে পারে। ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থায়ও। সম্প্রতি ব্রাজিল, মেক্সিকো, ইরাক, জর্ডানসহ বেশ কয়েকটি দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলন লক্ষণীয় যার মূলে রয়েছে বেকারত্ব।

বিশ্বের নামকরা 'নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা' ধারণা করছেন যে, কভিড পরবর্তী বিশ্বে আসন্ন নানামুখী সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না-পেরে বেশ কয়েকটি সরকারের পতন হতে পারে, বিশেষ করে স্বৈরাচারী সরকারগুলো। যে সরকারগুলো প্রথম থেকেই পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরে উদ্ভুত পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেছে, সঠিক তথ্য না-লুকিয়ে জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করেছে, জনগণের মেন্ডেট নিয়ে কাজ করেছে, সে সরকারগুলো সফলতার আলো দেখেছে। আর যে সরকারগুলো স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাজে গেমিংয়ে মেতে ছিল, সব সময়ের মত লুটপাটতন্ত্রের ছিলছিলা জারি রেখেছিল, তথ্য লুকিয়েছে, দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না-করে ধনিক শ্রেণিকে অনৈতিক সুবিধা দিয়েছে, জনগণের সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়নি, সে সরকারগুলো দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে ও হবে। মানুষের আয়-রোজগার না-থাকলে, পেটে ভাত না-পড়লে ঘরে বসে থাকবে না। রাস্তায় নামবে, বিদ্রোহ করবে। স্বৈরাচারী সরকারগুলো পরিস্থিতির গভীরতাকে উপেক্ষা করে উক্ত বিদ্রোহকে কঠোর হাতে দমন করতে চাইবে। রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে একচেটিয়াভাবে প্রশমিত করতে চাইবে সে গণ-উত্তেজনাকে। দেয়ালে পীঠ ঠেকে যাওয়াতে মানুষও এর চুড়ান্ত সমাধান চাইবে। ফলে, ঘটে যাবে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বরং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও নানামুখী মাত্রা যোগ হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, অগণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটপাট, কৃষক-শোষণ, সীমান্ত হত্যা, অর্থপাচার, বিনা চিকিৎসায় স্বজন হারানোর ক্ষোভ ইত্যাদি ঘি ঢালবে উক্ত বিদ্রোহের আগুনে। তাই ধারণা করা যায়, বেকারত্ব আমাদেরকে হাতছানি দিচ্ছে একটি মৌলিক পরিবর্তনের, যা আমাদেরকে অকল্পনীয় একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন করতে পারে।

[১৭.০৬.২০২০]

Wednesday, July 15, 2020

সবকিছু নতুন করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ হতে পারে || মুরশীদ সেলিন।


-লাদাখে ভারত-চীন মুখামুখি।
-পুলিশে সয়লাব হংকং, সেনাদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি।
-যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছল ইরানি ট্যাঙ্কার।
(দৈনিক মানবজমিন - ২৭ মে ২০২০)

বিশ্বের বেশীরভাগ সম্পদ যখন অল্পকিছু ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয় তখন কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই মাসের পর মাস লকডাউন দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে নাগরিকের ভরনপোষন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সে ধনী যুক্তরাষ্ট্র হোক কিংবা হোক সে দরিদ্র বাংলাদেশ। কেননা ব্যক্তির হাতে সম্পদের পূর্ন নিয়ন্ত্রন চলে যাওয়ায় রাষ্ট্রগুলো সেই সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিটি রাষ্ট্রের শ্রমজীবী মানুষদের জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কাজে ফিরে যাবার বিকল্প পথ আপাতত খোলা নেই, যখন দরিদ্ররা রাষ্ট্রকে কর দিতে অক্ষম এবং ধনীরা কর ফাঁকি দিতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছে।

নিওলিবারেলিজম পুজিবাদকে এমন অবয়বে হাজির করেছে, শোষন ও বৈষম্যের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে দেশে দেশে অসন্তোষ যার সাধারন পরিনতি। মানুষের এই ক্ষোভ মোকাবিলায় পুজিবাদের সামনে কর্তৃত্ববাদী পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থান ঘটানো ছাড়া আর বিকল্প ছিলো বলে মনে হয় না। বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করা ছাড়া একবিংশ শতাব্দীর তথ্য প্রবাহের যুগে শোষন চালু রাখা সম্ভব নয় এটা সকলেই বোঝে। ট্রাম্প, মোদী, বলসেনারো, জনসনসহ নাম বলার অযোগ্য এমন অনেক পপুলিস্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছে এরই ধারাবহিকতায়।

কিন্তু এতে যে শেষ রক্ষা হবে না এবং পরিনতি যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে তা অনুমিতই ছিলো। শতাব্দীর ভয়াবহতম বৈশ্বিক মহামারি সেই পরিনতির গতি তরান্বিত করছে হয়তো। এখান থেকে ঘটনা কখন কোনদিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মজার ব্যপার হচ্ছে নিওলিবারেলিজমের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে পপুলিস্ট রাজনীতির বিভ্রম প্রায় সব জায়গায় মধ্যপন্থী ও বামপন্থীদের যথাসম্ভব প্রতিরোধের মুখে পড়েছে এবং এখনো পড়ছে। কেবলমাত্র বাংলাদেশের মধ্য ও বামপন্থীরাই পপুলিজমের পালে হাওয়ার অনুকুলে সজোড়ে বৈঠা ঠেলেছে।

হতে পারে তারা এর বিপদ সম্পর্কে ধারনা করতে পারেনি অথবা তাদের ভিন্ন এজেণ্ডা ছিলো। আপাতদৃষ্টিতে দ্বিতীয়টি হবার সম্ভাবনাই প্রবল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

কিন্তু তাদের এই অবিমৃশ্যতার ফল যা হয়েছে তা হলো রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরকার প্রতিরোধক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, পারস্পরিক বিশ্বাসযাগ্যতা শূন্যের কোটায় নেমে আসা এবং জনগনের মাঝে অপ্রয়োজনীয় অথচ আত্মঘাতী বিভেদের পথ প্রশস্ত হওয়া।

সার্বিক পরিনতিতে বাংলাদেশে লুটপাট ও সম্পদ পাচারের যে কাঠামো গড়ে উঠেছে তা থেকে বেড়িয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেক্ষেত্রে আসন্ন ঝড়ের পর সবকিছু নতুন করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ হতে পারে।

২৮.০৫.২০২০

Tuesday, July 14, 2020

কেমন বাংলাদেশ চাই || মতামত সম্পাদনায় ভূবন মুন্সী।




মন্তব্যকারীদের মতামতের ভিত্তিতে উঠে আসে-

"সমান অধিকার, বাক স্বাধীনতা, মুক্ত ধারার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চা, বেকারত্ব দূর করা, পরমত সহিষ্ণুতা ও দেশজ চেতনায় সংহত হোক রাজনীতি, অবাধ নির্বাচন, সুষ্ঠ রাজনৈতিক পরিবেশ, বৈষম্য মুক্ত বাংলাদেশ, প্রকৃত স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংকট দূরীকরণ, জনসংখা বৃদ্ধির হার কমানো, নিরেপেক্ষ নির্বাচন, সঠিক রাজনীতি ও ঐক্য বদ্ধ জাতি।"

প্রশ্ন ছিলো-

স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে আজ আমাদের সবার


প্রধান চাওয়া কী?

দীর্ঘ পরম্পরার সূত্র ধরে দেশকে আমরা মা, মাতৃভূমি হিসেবেই জানি। তাই দেশ প্রাসঙ্গিক ভাবনা অতীত থেকেই আমাদের মধ্যে তীব্র ভাবে সংহত হয়ে ডালিমের মতো দানা বেধে থাকে সতেজ হয়ে। তবে কখনো কখনো তাতে দেখা গেছে শীত ঋতুর হলদে পাতা। সেই শীত পক্ষ পেরিয়ে আমরা বারেবারেই জানান দিয়েছি আমাদের স্বদম্ভ অস্তিত্ব। যথা সময়ে আপন স্বকীয়তায় হয়েছি যথার্থ। যে কারণে ইতিহাসে এ ভূখন্ড বোগলকপুর বা বিদ্রোহপুর হিসেবে পরিচিতি পায়। বৃটিশরা তাদের রাজধানী কলকাতা হতে দিল্লিতে ট্রান্সফার করে একই কারনে।

৭১ পরবর্তী স্বাধীন দেশে যথাযোগ্য উত্তরসুরীদের হারিয়ে এবং ১৪ই ডিসেম্বরের পরিনতি অর্থে বৌদ্ধিক শূন্যতার পথ ধরে আমরা অনেকটা পথ জানা নাই অবস্থায় আন্দাজে-গোলেমালে কোনরকমে মানচিত্র নিয়ে পথ হেঁটে এতটা দূর এসেছি। বর্তমানে নাকাল অবস্থা চারপাশ থেকে ঝেঁকে বসেছে, এমনকি ঋদ্ধ চেতনার সুঠাম দেহ ধারালো খঞ্জরে কেটেকুটে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। তাই দেশ প্রসঙ্গ আমাদের কাছে আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তারপরও দেশের ভালো মন্দের সাথেই তো আমাদের ভালো-মন্দ থাকার সম্পর্ক। তাই দেরিতে হলেও সে ভাবনা আজ আবার মাথা উচু করে দ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন স্যার একেই বাংলার বেতসীবৃত্তির বৈশিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

মানচিত্রের সাথে যেমন মানুষের ভালো-মন্দ থাকার সম্পর্ক, তেমনি মানচিত্র জেগে থাকে রাজনীতি মারফত। তাই অধিকাংশ মন্তব্যকারীর মতামত রাজনীতি প্রাসঙ্গিক হয়েই উঠে এসেছে। অর্থাৎ বোধের যথার্থ বাটনে চাপ পরেছে, তাই বাক শক্তিতে যথার্থ উচ্চারন এসেছে। আবার দীর্ঘ মেয়াদে দেশকে এগিয়ে নিতে গেলে বর্তমান প্রয়োজনকে সামনে রেখে নয়া আদর্শ অনুযায়ী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অনিবার্য। যার উপস্থিতিতে জনগন ব্যাকরনগত রাজনৈতিক চর্চাতে অভ্যস্থ হবে এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরেই দেশজ চেতনার জন্ম হবে অর্থাৎ যথার্থই বাংলা হয়ে উঠবে বাংলার।

তবে গনতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভোট মারফত পছন্দের সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গটাও অধিক গুরুত্ব দিয়ে উঠে এসেছে। কারন অস্বচ্ছ ভোট রাজনীতির পথ ধরেই দেশটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং পক্ষ-বিপক্ষের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জনগন মানচিত্র সমেত নরকে নিপতিত হয়। এ পথ ধরেই অসৎ আমলা, স্বার্থান্বেষী মহল স্বীয় স্বার্থ হাসিলের প্রশ্নে সরকার হিসেবে মসনদ দখল করে। আপন অযোগ্যতায় দেশকে বিদেশের করতলগত করে আর্থিক ব্যবস্থা সহ আইন-প্রশাসন ব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন করে তুলে। রাষ্ট্রিক যন্ত্রের যথার্থ উন্নয়নতো দূরের কথা, বরং তার কবলে পড়ে ও আপনার অন্ধ মোহে বিষিয়ে দেয় জনযাপন।

পরিশেষে আজ এটা আশা করাই সঙ্গত- আপন মানচিত্রের অক্ষমতা দূর করতে আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ হবো আপনার প্রয়োজনেই। মানচিত্রের সিঁথি থেকে মুছে দিয়ে কলঙ্কের সিঁদুর আমরা সকলেই হয়ে উঠবো নিষ্কলুষ। উত্তর প্রজন্ম যথাযথ সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরেই একদিন বাংলাদেশ কে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়।

সেই দিনের প্রতীক্ষায়...Video

[স্যোসাল মিডিয়া ফেসবুক পোস্ট মারফত মতামত/প্রত্যাশার কন্ঠ শোনা হয়েছিল।]
১৩.১০.২০১৮

আগামী পৃথিবীটা হোক সচেতন মানুষের পৃথিবী - মুরশীদ সেলিন।

 প্রাযুক্তিক বিকাশে বিশ্ব আজ গাঁয়ের চেয়েও ছোট। পৃথিবীর সব ভালো এবং কালিমার দৃশ্য গুলো আজ আমরা অনায়াসে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। পরস্পরকে পরস্পর মত দিতে পারি, মোটিভেট করতে পারি। প্রযুক্তির উল্লম্ফনে এই যে নতুন একটি পৃথিবীতে আমরা বাস করছি (নতুন বলেই পুরনো রীতি নীতি, পথ পদ্ধতি অকেজো হয়ে পড়ে হাল চাষের লাঙ্গলের মতোন, যুৎসই কোন মুক্তির পথই দেখাতে পারছে না), নতুন রূপটা যেন অধিক স্পষ্ট হলো করোনা মহামারীর সাথে। আমাদের ক্ষত ও ক্ষতি, সমস্যা, সম্ভাবনা, আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতি সব স্পষ্ট আজ বৌদ্ধিক চোখে। নতুন পৃথিবীতে আমাদের প্রত্যাশা কেমন, কিসের প্রত্যাশা?

'কেমন পৃথিবী দেখতে চাই' প্রসঙ্গে রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিশ্লেষক জনাব মুরশীদ সেলিনের সাথে আমাদের কথা হয়। শত ব্যস্ততার মাঝেও "মেসেঞ্জার অব কসমোলজি" কে সময় দেওয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। নিম্নে তাঁর মতামত আলোকপাত করা হলো:-

মুরশীদ সেলিন
"আগামী পৃথিবীটা হোক সচেতন মানুষের পৃথিবী"


কেমন পৃথিবী দেখতে চাই - প্রশ্নটা এমন না হয়ে ‘করোনাকালীন অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে কেমন পৃথিবী দেখা সম্ভব’ এমন হলে চিন্তাটা সহজ ও বাস্তবসম্মত হয়।

করোনা আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে আমাদের চিন্তা ও যাপনের ধরন। জীবিকা থেকে শুরু করে মানুষে মানুষে সম্পর্কের বন্ধন, এমনকি জীবনাবসানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বদলে গেছে। দৈনন্দিনতার প্রতি পদক্ষেপে আমাদের অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত হচ্ছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও সার্বজনীন তা হচ্ছে সচেতনতা। একটি রোগের বিষয়ে এতটা সচেতন ও সতর্ক এর আগে আমরা কখনো হইনি। করোনার কারন, এ থেকে বাঁচার উপায়, এর প্রতিরোধ, নিজে বা কাছের কেউ আক্রান্ত হলে করনীয়, সম্ভাব্য চিকিৎসা ও প্রতিষেধক, এমনকি করোনায় মৃতের সৎকার পদ্ধতি এসব বিষয়ে মানুষ যে পরিমান সতর্কতা ও সচেতনতা দেখিয়েছেন তা সচরাচর দেখা যায় না। এটা যে শুধু সমাজের উপরিতলায় হয়েছে তাই নয়, বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের সাথে ন্যূনতম সংযোগ আছে এমন সকলেই এখন একই পথের পথিক।

জীবন ও জীবিকা হারানোর ভয় আমাদের সচেতন হতে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমাদের জীবনঘনিষ্ঠ অনেক বিষয়েই আমরা যারপরনাই উদাসীন। আমাদের উদাসীনতার সুযোগ নিয়েই রাজনীতিবিদেরা আমাদের সাথে প্রতারনা করে, ব্যবসায়ীরা আমাদের ঠকায় এবং বুদ্ধিজিবীরা আমাদের বিভ্রান্ত করে। ফলে আমাদের কাঙ্খিত রাষ্ট্র, সমাজ বা পৃথিবী আমরা পাই না।

করোনাকালে অর্জিত এই সচেতনতার ব্যপ্তি যদি আমরা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অসঙ্গতি পর্যন্ত বিস্তৃত করতে পারি তাহলে আগামীর পৃথিবীটা বদলে দেয়া সম্ভব। বদলে দেয়া সম্ভব সেভাবে যেভাবে আমরা চাইবো। পরিবর্তনের আকাঙ্খায় গনমানুষের ব্যপক সচেতনতাটাই মূখ্য। অন্যথায় পৃথিবী বদলাবে না।

আগামী পৃথিবীটা হোক সচেতন মানুষের পৃথিবী।

১৪.০৭.২০২০

Sunday, July 12, 2020

আমাদের পৃথিবী : একবিংশ শতাব্দীর দুই দশক - ভূবন মুন্সী।


শুরুতে সমাপ্তির গল্প:

 

"This is a small step for man, but a giant leap for the mankind." হ্যাঁ, ছোট পদক্ষেপ। কিন্তু  রূপকথার মতোন। ১৯৬৯ সন। ২০ জুলাই। কিছু ক্ষণের মধ্যেই চাঁদে প্রথম পা রাখবে মানুষ। নীল আর্মস্ট্রং ইতিহাস হয়ে যাবে। রূপকথার নায়কের মতোন নীল আর্মস্ট্রং আজ ইতিহাস। কিন্তু এটাই সবটা নয়। গত শতাব্দীতে ঘটে গেছে আরও সুন্দর এবং কুৎসিত ঘটনা সব। ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছিলো দেশে দেশে। আবার দেশে দেশে ডানা মেলেছে স্বাধীনতার রকমারী ঝান্ডা। ঘটে গেছে ভয়ংকর ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ। মানুষ দেখেছে নিউক্লিয় শক্তির শিব তান্ডব : হিরোশিমা, নাগাসাকি। প্রত্যেক মুহূর্তে শঙ্কা জাগিয়েছে স্নায়ু যুদ্ধ। ঘটে গেছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং : বেড়ে গেছে সি লেভেল। আমরা দেখেছি প্রযুক্তির উল্লম্ফন পর্ব, মিডিয়ার রেভুলেশন। মানুষ হয়তো আজীবন পৃথক থাকার জন্য গড়ে তুলেছিলো বার্লিন প্রাচীর, আবার ভেঙে ফেলেছে। হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম এবং মৃত্যু। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মুক্ত বাজার অর্থনীতির ধারণা আজও লাগামহীন গতি নিয়ে ছুটছে। কোথায়, কোন গন্তব্যে ছুটছে?

মোমবাতির মতোন গলতে থাকলো টুইন টাওয়ার:

 

৯/১১. আগুন ও মৃত্যুর স্মৃতি। তখন সকাল। স্থানীয় সময় ৮:৪৬. শতাব্দীর শুরুতেই বুক পিঠে ছিদ্র হলো টুইন টাওয়ার। লাশের মিছিল গুণতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলো পৃথিবী। সহস্রাব্দের বরণ বাতি তখনো নেভেনি। অথচ মোমবাতির মতোন গলতে থাকলো টাওয়ার। এ আগুন নেভাতে গিয়েই প্রেসিডেন্ট বুশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আওয়াজ দিলেন। তারই পথ ধরে ধ্বংস স্তুপ হলো আফগানিস্তান, ইরাক এবং আরও। ২০১১ সালে আমেরিকান নেভী সিলের হাতে ওসামা বিন লাদেন এর মৃত্যু হলো। কিন্তু শতাব্দীর সন্ত্রাসবাদের আগুন এখনো নিভলো না। সাদ্দাম হতে বাশার কিংবা ইরাক হতে সিরিয়া আগুন জ্বলছেই।

টুইন টাওয়ার হামলা

চিচিং ফাঁক এবং আলাদিনের চেরাগ:

 

আলিফলায়লাটিক চেইঞ্জ। প্রয়াত পিতাগণ এটা কল্পনাও করতে পারেনি। স্টিভ জবসের হাতে  ২০০১ সালে আইপডের যাত্রা। ২০০৪ এ জাকারবার্গের হাতে ফেসবুকের জন্ম। আজ ২৪৫ কোটি মানুষের ফেসবুক পরিবার। ২০০০ সালে শুরু হওয়া জিপিএস আজ অনায়াসেই খুনিকে ধরে ফেলছে। মানুষের হাঁচি আর কাশি দুটুর কারণই শনাক্ত করে ফেলছে যন্ত্র। স্মার্ট ফোনের বদৌলতে পৃথিবীটা আজ হাতের মুঠোয়। কি সহজে প্রযুক্তির দৈত্যটা সব ইচ্ছা পূরণ করে দিচ্ছে মুহূর্তেই। অচেনাকে চিনিয়ে দিচ্ছে। অজানাকে জানিয়ে দিচ্ছে। ইচ্ছা গুলোও বুঝতে সময় নিচ্ছে না। চিচিং ফাঁক মন্ত্র উচ্চারণের সময়টুকুর চেয়ে দ্রুতগামী আজকের প্রযুক্তি। আলিফলায়লাটিক পৃথিবী।

পানির খোঁজে মঙ্গলে, পৃথিবীতে প্রাণের সংকট:

 

মহাকাশ তন্ন তন্ন করে চষে ফিরছে মানুষ। চাঁদের পর মঙ্গল, অগ্নি দানব সূর্যের দিকেও তল্লাশি চালাচ্ছে পৃথিবী। অথচ কি বিস্ময়! পৃথিবীতে প্রাণের সংকট। আর মানুষ নিজেই স্ব-বিনাশের কারণ। আপাত চোখে এটা মানুষের স্ববিরোধী আচরণ। বস্তুত দেখতে যতটা  নিরীহ মনে হয়, মানুষ ঠিক ততোটাই চতুর ও হিংসাত্মক। মঙ্গলে জল পাওয়া গিয়েছে ২০১৮ সালে। এটা নিয়ে মিডিয়ার হৈচৈ।  অথচ এ সালের হিসেব মতেই শতকরা ৯.২ জন মানুষ চরম খাদ্য সংকটে। সেলুকাস! গত শতাব্দীতেও মানুষ দেখেছে ভারতে বৃটিশদের নারকীয় শাসন। দেখেছে মানুষ কেমন করে  আকাল আর দুর্ভিক্ষ প্রসব করে।

প্লুটো বিদায় নিলো সৌর পরিবার হতে, স্টিফেন হকিং পৃথিবী হতে:

 

২০০৬ সন। প্লুটো সৌর গ্রহ পরিবার হতে বিদায় নিলো। একই বছর ইন্ডিয়ার মুম্বাইয়ে ট্রেন বোম্বিং। ২০৯ জনের মৃত্যু। সদ্য লাঞ্চ করা টুইটারে সে সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। আজ শোক সংবাদগুলো খুব দ্রুতই সোসাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। কখনো বুআজিজি বসন্তের আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সোসাল মিডিয়ায়। কাঁপিয়ে দেয় আরব অঞ্চল। শুধু প্লুটো নামক গ্রহ নয়, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্গারেট থ্যাচার, স্টিফেন হকিং কিংবা মাইকেল জ্যাকসনের মতোন অসংখ্য নক্ষত্র এই দুই দশকের মধ্যেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

সুনামির তান্ডব, ফ্লু এবং বৈশ্বিক মন্দা:

 

২৬শে ডিসেম্বর ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ। স্থানীয় সময় ৭:৫৮:৫৩, সূর্য মাথা তুলেছে মাত্র। ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলো ১৪টি দেশে। মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ২২ লক্ষ ২৭ হাজার। দুহাজার দশের হাইতির ভূমিকম্পে মারা গেলো ২ লক্ষ ৩০ হাজার। আহ্। কী দীর্ঘ মৃত্যুর মিছিল। সে বছরই লাঞ্চ করা ইনস্ট্রাগ্রামে ভাইরাল সব শোক ছবি। বাংলাদেশের রানা প্লাজার সেই শ্রমিকদের বেঁচে থাকার আর্তি আজও বাতাসে ভাসে। ২০০৭-০৮ সনের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা। ৮৭ লক্ষ মানুষ চাকরিচ্যুত। শ্রমিকরাই সব সময় বেশি বঞ্চিত হয়। তারাই বেশি আক্রান্ত হয় সোয়াইন ফ্লু, ইবোলা কিংবা করোনাতে। ভাইরাস কিংবা ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা মানব সৃষ্ট বঞ্চিতরাই বেশি বঞ্চিত হয়। বৈষম্যের চাকা থামবো কখোন?

করোনার পর সকলে স্পষ্ট হলো নেতৃত্ব শূন্য পৃথিবী:

 


প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা
বেনগাজীতে গাদ্দাফির পতন। আরেক গাদ্দাফির মসনদ আরোহন। বুশ কিংবা ক্যারিশমাটিক ওবামা, দিন শেষে দেখলাম তফাত নেই। যখন মোড়ল রাষ্ট্রে একজন খাঁটি বণিক ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট বনে গেলেন, তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না মতাদর্শিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে নেতৃত্ব শূন্য পৃথিবী। মূলত বণিকরাই বিভিন্ন বেশ ধরে পূঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থা চালু রাখছেন দেশে। কলম কিংবা বন্দুক, কিতাব কিংবা খেতাব সবটাই পণ্য হয়ে গেছে।

পৃথিবীর জিভে ক্ষত, নৈতিক সংকট, অস্থিরতা:

 

First genetically modified children were born on November, 2018! এটা খুবই বিস্ময়! মানুষ জীবনের মর্মমূলে হাত দিতে সক্ষম। টেস্ট টিউব বেবি, জেনেটিক বেবি, অধিক ফলনশীল শস্য সবটা বিস্ময়কর। তবু মানুষ কি আজও হৃদয় ছুঁতে পেলো? আলোয় উদ্ভাসিত পৃথিবী। অথচ আত্মহত্যার লাইন ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে। সভ্যতা এগিয়েছে পোশাকে। ভেতরে ভেতরে এসেছে নগ্নতা। ওপেন সেক্স, ড্রাগ, ব্রোকেন ফ্যামিলি, সমকামী কোন নিক্তিতে এগুলো বৈধতার লাইসেন্স পেতে পারে? তবুও পেয়ে যাচ্ছে। এখানেই কথিত গণতন্ত্রের গলদ। মন্দটা আইডেন্টিফাই করা গেলেও সাংখ্যিক জোরে থামানো যায় না। Nation is in sleeping pils and sex disease. পৃথিবীর জিভে ক্ষত। জীবনের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না আজকাল। কাশ্মীর, ফিলিস্তিন তো পৃথিবীর জৈবিক জিভে ক্ষত হয়ে সেই কবে থেকে জিইয়ে আছে।

জলবায়ুর পরিবর্তন, জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিবাদ সমেত পৃথিবী মৃত্যু শয্যায়:

 

১৯৫০ সালে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের যাত্রা শুরু। একবিংশের সাথে সাথে যাত্রা করেছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। জাতীয়তাবাদের মন্ত্র পাঠে পৃথিবীতে মানুষ একদিন ভেঙেছে পরাধীনতার শিকল। জন্ম দিয়েছে নয়া শৃঙ্খলার। পুঁজিবাদও একদিন পৃথিবীকে নিয়ে বিকাশের পথে হেঁটেছে। শৃঙ্খলা পুরনো হয়ে গেলে সেটা আবার শিকল হয়ে যায়। জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিবাদ দুটোই আজ পায়ের শিকল। মানুষের বিকাশ ও ভালো থাকার অন্তরায়। এ দুই ব্যাকডেটেড মন্ত্র হাতে নিয়েই কতিপয় চালাচ্ছে পৃথিবীর উপর বর্বরোচিত বলাৎকার।  মাটি মুখ বুঝে সইতে পারে, জলবায়ু বড্ড জেদী। নিজেকে পাল্টে নিয়ে সে আজ বিপন্ন করে দিচ্ছে পৃথিবীর মানব জীবন। ভাইরাস থেকে ভূমিকম্প সবটা নিয়েই প্রকৃতি খড়গহস্ত। নতুন নতুন মহামারী আর পিছু ছাড়ছেনা।

পৃথিবী বিনির্মানের আহবান:

 

কে জানতো বসন্তের আগুনে পুড়বে নিউইয়র্ক! সেই টুইন টাওয়ার। দুই দশক পূর্বের কথা। দুই দশকের প্রান্তে এসে আঘাত হানলো করোনা। অথচ সেদিনের মতোন আজও মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের প্রস্তুতি চলছিলো। দুই দশক পূর্ব হতে পরিণতির দিকে পৃথিবীর যে যাত্রা আজ যেন তা পূর্ণ হলো। সেদিনের আংশিক থ্রেট খাওয়া পৃথিবী আজ একঘর, একাকার। প্রাযুক্তিক বিকাশে বিশ্ব আজ গাঁয়ের চেয়েও ছোট।

প্রাযুক্তিক বিকাশে এটা আজ স্পষ্ট সমগ্র মানুষের জন্য একটিই পৃথিবী, লাব্ববাইক কন্ঠের অধিকারী শুধুই মানুষ, নষ্টকে নষ্ট বলার বোধ কিংবা মানিনা বলতে পারা অথবা সুন্দরকে ধারন করা বা নতুনকে মেনে চলার সক্ষমতা শুধুই মানুষের।

নষ্ট সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার দায় কিংবা যথার্থ সূর্যটাকে খুঁজে এনে ভোর উঠাবার বীরত্ব শুধুই মানুষের।

ভালোটা তরঙ্গ হয়ে ছুঁয়ে যায় সমগ্র ভুবন, তেমনি মন্দটা বিষ হয়ে বিষিয়ে দেয় সবার যাপন। বেঁচে থাকার বা বাঁচিয়ে রাখার একটিই কিশতি আজ, ভালো বা মন্দ সবটা সবার সাথে একাকার।

মহাবিশ্বের এই সবুজ কিশতিতে অখন্ড মানবিক বোধে আমরা হয়ে উঠি একজন- ইউনিটি অব ম্যান। প্রত্যহ খুঁজে আনি যথার্থ সুন্দর, যথার্থ সূর্য সকাল।

১৩.০৭.২০২০