Wednesday, July 15, 2020

সবকিছু নতুন করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ হতে পারে || মুরশীদ সেলিন।


-লাদাখে ভারত-চীন মুখামুখি।
-পুলিশে সয়লাব হংকং, সেনাদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি।
-যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছল ইরানি ট্যাঙ্কার।
(দৈনিক মানবজমিন - ২৭ মে ২০২০)

বিশ্বের বেশীরভাগ সম্পদ যখন অল্পকিছু ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয় তখন কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই মাসের পর মাস লকডাউন দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে নাগরিকের ভরনপোষন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সে ধনী যুক্তরাষ্ট্র হোক কিংবা হোক সে দরিদ্র বাংলাদেশ। কেননা ব্যক্তির হাতে সম্পদের পূর্ন নিয়ন্ত্রন চলে যাওয়ায় রাষ্ট্রগুলো সেই সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিটি রাষ্ট্রের শ্রমজীবী মানুষদের জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কাজে ফিরে যাবার বিকল্প পথ আপাতত খোলা নেই, যখন দরিদ্ররা রাষ্ট্রকে কর দিতে অক্ষম এবং ধনীরা কর ফাঁকি দিতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছে।

নিওলিবারেলিজম পুজিবাদকে এমন অবয়বে হাজির করেছে, শোষন ও বৈষম্যের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে দেশে দেশে অসন্তোষ যার সাধারন পরিনতি। মানুষের এই ক্ষোভ মোকাবিলায় পুজিবাদের সামনে কর্তৃত্ববাদী পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থান ঘটানো ছাড়া আর বিকল্প ছিলো বলে মনে হয় না। বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করা ছাড়া একবিংশ শতাব্দীর তথ্য প্রবাহের যুগে শোষন চালু রাখা সম্ভব নয় এটা সকলেই বোঝে। ট্রাম্প, মোদী, বলসেনারো, জনসনসহ নাম বলার অযোগ্য এমন অনেক পপুলিস্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছে এরই ধারাবহিকতায়।

কিন্তু এতে যে শেষ রক্ষা হবে না এবং পরিনতি যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে তা অনুমিতই ছিলো। শতাব্দীর ভয়াবহতম বৈশ্বিক মহামারি সেই পরিনতির গতি তরান্বিত করছে হয়তো। এখান থেকে ঘটনা কখন কোনদিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মজার ব্যপার হচ্ছে নিওলিবারেলিজমের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে পপুলিস্ট রাজনীতির বিভ্রম প্রায় সব জায়গায় মধ্যপন্থী ও বামপন্থীদের যথাসম্ভব প্রতিরোধের মুখে পড়েছে এবং এখনো পড়ছে। কেবলমাত্র বাংলাদেশের মধ্য ও বামপন্থীরাই পপুলিজমের পালে হাওয়ার অনুকুলে সজোড়ে বৈঠা ঠেলেছে।

হতে পারে তারা এর বিপদ সম্পর্কে ধারনা করতে পারেনি অথবা তাদের ভিন্ন এজেণ্ডা ছিলো। আপাতদৃষ্টিতে দ্বিতীয়টি হবার সম্ভাবনাই প্রবল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

কিন্তু তাদের এই অবিমৃশ্যতার ফল যা হয়েছে তা হলো রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরকার প্রতিরোধক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, পারস্পরিক বিশ্বাসযাগ্যতা শূন্যের কোটায় নেমে আসা এবং জনগনের মাঝে অপ্রয়োজনীয় অথচ আত্মঘাতী বিভেদের পথ প্রশস্ত হওয়া।

সার্বিক পরিনতিতে বাংলাদেশে লুটপাট ও সম্পদ পাচারের যে কাঠামো গড়ে উঠেছে তা থেকে বেড়িয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেক্ষেত্রে আসন্ন ঝড়ের পর সবকিছু নতুন করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ হতে পারে।

২৮.০৫.২০২০

Tuesday, July 14, 2020

কেমন বাংলাদেশ চাই || মতামত সম্পাদনায় ভূবন মুন্সী।




মন্তব্যকারীদের মতামতের ভিত্তিতে উঠে আসে-

"সমান অধিকার, বাক স্বাধীনতা, মুক্ত ধারার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চা, বেকারত্ব দূর করা, পরমত সহিষ্ণুতা ও দেশজ চেতনায় সংহত হোক রাজনীতি, অবাধ নির্বাচন, সুষ্ঠ রাজনৈতিক পরিবেশ, বৈষম্য মুক্ত বাংলাদেশ, প্রকৃত স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংকট দূরীকরণ, জনসংখা বৃদ্ধির হার কমানো, নিরেপেক্ষ নির্বাচন, সঠিক রাজনীতি ও ঐক্য বদ্ধ জাতি।"

প্রশ্ন ছিলো-

স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে আজ আমাদের সবার


প্রধান চাওয়া কী?

দীর্ঘ পরম্পরার সূত্র ধরে দেশকে আমরা মা, মাতৃভূমি হিসেবেই জানি। তাই দেশ প্রাসঙ্গিক ভাবনা অতীত থেকেই আমাদের মধ্যে তীব্র ভাবে সংহত হয়ে ডালিমের মতো দানা বেধে থাকে সতেজ হয়ে। তবে কখনো কখনো তাতে দেখা গেছে শীত ঋতুর হলদে পাতা। সেই শীত পক্ষ পেরিয়ে আমরা বারেবারেই জানান দিয়েছি আমাদের স্বদম্ভ অস্তিত্ব। যথা সময়ে আপন স্বকীয়তায় হয়েছি যথার্থ। যে কারণে ইতিহাসে এ ভূখন্ড বোগলকপুর বা বিদ্রোহপুর হিসেবে পরিচিতি পায়। বৃটিশরা তাদের রাজধানী কলকাতা হতে দিল্লিতে ট্রান্সফার করে একই কারনে।

৭১ পরবর্তী স্বাধীন দেশে যথাযোগ্য উত্তরসুরীদের হারিয়ে এবং ১৪ই ডিসেম্বরের পরিনতি অর্থে বৌদ্ধিক শূন্যতার পথ ধরে আমরা অনেকটা পথ জানা নাই অবস্থায় আন্দাজে-গোলেমালে কোনরকমে মানচিত্র নিয়ে পথ হেঁটে এতটা দূর এসেছি। বর্তমানে নাকাল অবস্থা চারপাশ থেকে ঝেঁকে বসেছে, এমনকি ঋদ্ধ চেতনার সুঠাম দেহ ধারালো খঞ্জরে কেটেকুটে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। তাই দেশ প্রসঙ্গ আমাদের কাছে আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তারপরও দেশের ভালো মন্দের সাথেই তো আমাদের ভালো-মন্দ থাকার সম্পর্ক। তাই দেরিতে হলেও সে ভাবনা আজ আবার মাথা উচু করে দ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন স্যার একেই বাংলার বেতসীবৃত্তির বৈশিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

মানচিত্রের সাথে যেমন মানুষের ভালো-মন্দ থাকার সম্পর্ক, তেমনি মানচিত্র জেগে থাকে রাজনীতি মারফত। তাই অধিকাংশ মন্তব্যকারীর মতামত রাজনীতি প্রাসঙ্গিক হয়েই উঠে এসেছে। অর্থাৎ বোধের যথার্থ বাটনে চাপ পরেছে, তাই বাক শক্তিতে যথার্থ উচ্চারন এসেছে। আবার দীর্ঘ মেয়াদে দেশকে এগিয়ে নিতে গেলে বর্তমান প্রয়োজনকে সামনে রেখে নয়া আদর্শ অনুযায়ী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অনিবার্য। যার উপস্থিতিতে জনগন ব্যাকরনগত রাজনৈতিক চর্চাতে অভ্যস্থ হবে এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরেই দেশজ চেতনার জন্ম হবে অর্থাৎ যথার্থই বাংলা হয়ে উঠবে বাংলার।

তবে গনতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভোট মারফত পছন্দের সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গটাও অধিক গুরুত্ব দিয়ে উঠে এসেছে। কারন অস্বচ্ছ ভোট রাজনীতির পথ ধরেই দেশটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং পক্ষ-বিপক্ষের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জনগন মানচিত্র সমেত নরকে নিপতিত হয়। এ পথ ধরেই অসৎ আমলা, স্বার্থান্বেষী মহল স্বীয় স্বার্থ হাসিলের প্রশ্নে সরকার হিসেবে মসনদ দখল করে। আপন অযোগ্যতায় দেশকে বিদেশের করতলগত করে আর্থিক ব্যবস্থা সহ আইন-প্রশাসন ব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন করে তুলে। রাষ্ট্রিক যন্ত্রের যথার্থ উন্নয়নতো দূরের কথা, বরং তার কবলে পড়ে ও আপনার অন্ধ মোহে বিষিয়ে দেয় জনযাপন।

পরিশেষে আজ এটা আশা করাই সঙ্গত- আপন মানচিত্রের অক্ষমতা দূর করতে আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ হবো আপনার প্রয়োজনেই। মানচিত্রের সিঁথি থেকে মুছে দিয়ে কলঙ্কের সিঁদুর আমরা সকলেই হয়ে উঠবো নিষ্কলুষ। উত্তর প্রজন্ম যথাযথ সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরেই একদিন বাংলাদেশ কে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়।

সেই দিনের প্রতীক্ষায়...Video

[স্যোসাল মিডিয়া ফেসবুক পোস্ট মারফত মতামত/প্রত্যাশার কন্ঠ শোনা হয়েছিল।]
১৩.১০.২০১৮

আগামী পৃথিবীটা হোক সচেতন মানুষের পৃথিবী - মুরশীদ সেলিন।

 প্রাযুক্তিক বিকাশে বিশ্ব আজ গাঁয়ের চেয়েও ছোট। পৃথিবীর সব ভালো এবং কালিমার দৃশ্য গুলো আজ আমরা অনায়াসে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। পরস্পরকে পরস্পর মত দিতে পারি, মোটিভেট করতে পারি। প্রযুক্তির উল্লম্ফনে এই যে নতুন একটি পৃথিবীতে আমরা বাস করছি (নতুন বলেই পুরনো রীতি নীতি, পথ পদ্ধতি অকেজো হয়ে পড়ে হাল চাষের লাঙ্গলের মতোন, যুৎসই কোন মুক্তির পথই দেখাতে পারছে না), নতুন রূপটা যেন অধিক স্পষ্ট হলো করোনা মহামারীর সাথে। আমাদের ক্ষত ও ক্ষতি, সমস্যা, সম্ভাবনা, আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতি সব স্পষ্ট আজ বৌদ্ধিক চোখে। নতুন পৃথিবীতে আমাদের প্রত্যাশা কেমন, কিসের প্রত্যাশা?

'কেমন পৃথিবী দেখতে চাই' প্রসঙ্গে রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিশ্লেষক জনাব মুরশীদ সেলিনের সাথে আমাদের কথা হয়। শত ব্যস্ততার মাঝেও "মেসেঞ্জার অব কসমোলজি" কে সময় দেওয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। নিম্নে তাঁর মতামত আলোকপাত করা হলো:-

মুরশীদ সেলিন
"আগামী পৃথিবীটা হোক সচেতন মানুষের পৃথিবী"


কেমন পৃথিবী দেখতে চাই - প্রশ্নটা এমন না হয়ে ‘করোনাকালীন অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে কেমন পৃথিবী দেখা সম্ভব’ এমন হলে চিন্তাটা সহজ ও বাস্তবসম্মত হয়।

করোনা আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে আমাদের চিন্তা ও যাপনের ধরন। জীবিকা থেকে শুরু করে মানুষে মানুষে সম্পর্কের বন্ধন, এমনকি জীবনাবসানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বদলে গেছে। দৈনন্দিনতার প্রতি পদক্ষেপে আমাদের অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত হচ্ছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও সার্বজনীন তা হচ্ছে সচেতনতা। একটি রোগের বিষয়ে এতটা সচেতন ও সতর্ক এর আগে আমরা কখনো হইনি। করোনার কারন, এ থেকে বাঁচার উপায়, এর প্রতিরোধ, নিজে বা কাছের কেউ আক্রান্ত হলে করনীয়, সম্ভাব্য চিকিৎসা ও প্রতিষেধক, এমনকি করোনায় মৃতের সৎকার পদ্ধতি এসব বিষয়ে মানুষ যে পরিমান সতর্কতা ও সচেতনতা দেখিয়েছেন তা সচরাচর দেখা যায় না। এটা যে শুধু সমাজের উপরিতলায় হয়েছে তাই নয়, বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের সাথে ন্যূনতম সংযোগ আছে এমন সকলেই এখন একই পথের পথিক।

জীবন ও জীবিকা হারানোর ভয় আমাদের সচেতন হতে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমাদের জীবনঘনিষ্ঠ অনেক বিষয়েই আমরা যারপরনাই উদাসীন। আমাদের উদাসীনতার সুযোগ নিয়েই রাজনীতিবিদেরা আমাদের সাথে প্রতারনা করে, ব্যবসায়ীরা আমাদের ঠকায় এবং বুদ্ধিজিবীরা আমাদের বিভ্রান্ত করে। ফলে আমাদের কাঙ্খিত রাষ্ট্র, সমাজ বা পৃথিবী আমরা পাই না।

করোনাকালে অর্জিত এই সচেতনতার ব্যপ্তি যদি আমরা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অসঙ্গতি পর্যন্ত বিস্তৃত করতে পারি তাহলে আগামীর পৃথিবীটা বদলে দেয়া সম্ভব। বদলে দেয়া সম্ভব সেভাবে যেভাবে আমরা চাইবো। পরিবর্তনের আকাঙ্খায় গনমানুষের ব্যপক সচেতনতাটাই মূখ্য। অন্যথায় পৃথিবী বদলাবে না।

আগামী পৃথিবীটা হোক সচেতন মানুষের পৃথিবী।

১৪.০৭.২০২০

Sunday, July 12, 2020

আমাদের পৃথিবী : একবিংশ শতাব্দীর দুই দশক - ভূবন মুন্সী।


শুরুতে সমাপ্তির গল্প:

 

"This is a small step for man, but a giant leap for the mankind." হ্যাঁ, ছোট পদক্ষেপ। কিন্তু  রূপকথার মতোন। ১৯৬৯ সন। ২০ জুলাই। কিছু ক্ষণের মধ্যেই চাঁদে প্রথম পা রাখবে মানুষ। নীল আর্মস্ট্রং ইতিহাস হয়ে যাবে। রূপকথার নায়কের মতোন নীল আর্মস্ট্রং আজ ইতিহাস। কিন্তু এটাই সবটা নয়। গত শতাব্দীতে ঘটে গেছে আরও সুন্দর এবং কুৎসিত ঘটনা সব। ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছিলো দেশে দেশে। আবার দেশে দেশে ডানা মেলেছে স্বাধীনতার রকমারী ঝান্ডা। ঘটে গেছে ভয়ংকর ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ। মানুষ দেখেছে নিউক্লিয় শক্তির শিব তান্ডব : হিরোশিমা, নাগাসাকি। প্রত্যেক মুহূর্তে শঙ্কা জাগিয়েছে স্নায়ু যুদ্ধ। ঘটে গেছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং : বেড়ে গেছে সি লেভেল। আমরা দেখেছি প্রযুক্তির উল্লম্ফন পর্ব, মিডিয়ার রেভুলেশন। মানুষ হয়তো আজীবন পৃথক থাকার জন্য গড়ে তুলেছিলো বার্লিন প্রাচীর, আবার ভেঙে ফেলেছে। হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম এবং মৃত্যু। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মুক্ত বাজার অর্থনীতির ধারণা আজও লাগামহীন গতি নিয়ে ছুটছে। কোথায়, কোন গন্তব্যে ছুটছে?

মোমবাতির মতোন গলতে থাকলো টুইন টাওয়ার:

 

৯/১১. আগুন ও মৃত্যুর স্মৃতি। তখন সকাল। স্থানীয় সময় ৮:৪৬. শতাব্দীর শুরুতেই বুক পিঠে ছিদ্র হলো টুইন টাওয়ার। লাশের মিছিল গুণতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলো পৃথিবী। সহস্রাব্দের বরণ বাতি তখনো নেভেনি। অথচ মোমবাতির মতোন গলতে থাকলো টাওয়ার। এ আগুন নেভাতে গিয়েই প্রেসিডেন্ট বুশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আওয়াজ দিলেন। তারই পথ ধরে ধ্বংস স্তুপ হলো আফগানিস্তান, ইরাক এবং আরও। ২০১১ সালে আমেরিকান নেভী সিলের হাতে ওসামা বিন লাদেন এর মৃত্যু হলো। কিন্তু শতাব্দীর সন্ত্রাসবাদের আগুন এখনো নিভলো না। সাদ্দাম হতে বাশার কিংবা ইরাক হতে সিরিয়া আগুন জ্বলছেই।

টুইন টাওয়ার হামলা

চিচিং ফাঁক এবং আলাদিনের চেরাগ:

 

আলিফলায়লাটিক চেইঞ্জ। প্রয়াত পিতাগণ এটা কল্পনাও করতে পারেনি। স্টিভ জবসের হাতে  ২০০১ সালে আইপডের যাত্রা। ২০০৪ এ জাকারবার্গের হাতে ফেসবুকের জন্ম। আজ ২৪৫ কোটি মানুষের ফেসবুক পরিবার। ২০০০ সালে শুরু হওয়া জিপিএস আজ অনায়াসেই খুনিকে ধরে ফেলছে। মানুষের হাঁচি আর কাশি দুটুর কারণই শনাক্ত করে ফেলছে যন্ত্র। স্মার্ট ফোনের বদৌলতে পৃথিবীটা আজ হাতের মুঠোয়। কি সহজে প্রযুক্তির দৈত্যটা সব ইচ্ছা পূরণ করে দিচ্ছে মুহূর্তেই। অচেনাকে চিনিয়ে দিচ্ছে। অজানাকে জানিয়ে দিচ্ছে। ইচ্ছা গুলোও বুঝতে সময় নিচ্ছে না। চিচিং ফাঁক মন্ত্র উচ্চারণের সময়টুকুর চেয়ে দ্রুতগামী আজকের প্রযুক্তি। আলিফলায়লাটিক পৃথিবী।

পানির খোঁজে মঙ্গলে, পৃথিবীতে প্রাণের সংকট:

 

মহাকাশ তন্ন তন্ন করে চষে ফিরছে মানুষ। চাঁদের পর মঙ্গল, অগ্নি দানব সূর্যের দিকেও তল্লাশি চালাচ্ছে পৃথিবী। অথচ কি বিস্ময়! পৃথিবীতে প্রাণের সংকট। আর মানুষ নিজেই স্ব-বিনাশের কারণ। আপাত চোখে এটা মানুষের স্ববিরোধী আচরণ। বস্তুত দেখতে যতটা  নিরীহ মনে হয়, মানুষ ঠিক ততোটাই চতুর ও হিংসাত্মক। মঙ্গলে জল পাওয়া গিয়েছে ২০১৮ সালে। এটা নিয়ে মিডিয়ার হৈচৈ।  অথচ এ সালের হিসেব মতেই শতকরা ৯.২ জন মানুষ চরম খাদ্য সংকটে। সেলুকাস! গত শতাব্দীতেও মানুষ দেখেছে ভারতে বৃটিশদের নারকীয় শাসন। দেখেছে মানুষ কেমন করে  আকাল আর দুর্ভিক্ষ প্রসব করে।

প্লুটো বিদায় নিলো সৌর পরিবার হতে, স্টিফেন হকিং পৃথিবী হতে:

 

২০০৬ সন। প্লুটো সৌর গ্রহ পরিবার হতে বিদায় নিলো। একই বছর ইন্ডিয়ার মুম্বাইয়ে ট্রেন বোম্বিং। ২০৯ জনের মৃত্যু। সদ্য লাঞ্চ করা টুইটারে সে সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। আজ শোক সংবাদগুলো খুব দ্রুতই সোসাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। কখনো বুআজিজি বসন্তের আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সোসাল মিডিয়ায়। কাঁপিয়ে দেয় আরব অঞ্চল। শুধু প্লুটো নামক গ্রহ নয়, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্গারেট থ্যাচার, স্টিফেন হকিং কিংবা মাইকেল জ্যাকসনের মতোন অসংখ্য নক্ষত্র এই দুই দশকের মধ্যেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

সুনামির তান্ডব, ফ্লু এবং বৈশ্বিক মন্দা:

 

২৬শে ডিসেম্বর ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ। স্থানীয় সময় ৭:৫৮:৫৩, সূর্য মাথা তুলেছে মাত্র। ৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলো ১৪টি দেশে। মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ২২ লক্ষ ২৭ হাজার। দুহাজার দশের হাইতির ভূমিকম্পে মারা গেলো ২ লক্ষ ৩০ হাজার। আহ্। কী দীর্ঘ মৃত্যুর মিছিল। সে বছরই লাঞ্চ করা ইনস্ট্রাগ্রামে ভাইরাল সব শোক ছবি। বাংলাদেশের রানা প্লাজার সেই শ্রমিকদের বেঁচে থাকার আর্তি আজও বাতাসে ভাসে। ২০০৭-০৮ সনের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা। ৮৭ লক্ষ মানুষ চাকরিচ্যুত। শ্রমিকরাই সব সময় বেশি বঞ্চিত হয়। তারাই বেশি আক্রান্ত হয় সোয়াইন ফ্লু, ইবোলা কিংবা করোনাতে। ভাইরাস কিংবা ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা মানব সৃষ্ট বঞ্চিতরাই বেশি বঞ্চিত হয়। বৈষম্যের চাকা থামবো কখোন?

করোনার পর সকলে স্পষ্ট হলো নেতৃত্ব শূন্য পৃথিবী:

 


প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা
বেনগাজীতে গাদ্দাফির পতন। আরেক গাদ্দাফির মসনদ আরোহন। বুশ কিংবা ক্যারিশমাটিক ওবামা, দিন শেষে দেখলাম তফাত নেই। যখন মোড়ল রাষ্ট্রে একজন খাঁটি বণিক ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট বনে গেলেন, তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না মতাদর্শিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে নেতৃত্ব শূন্য পৃথিবী। মূলত বণিকরাই বিভিন্ন বেশ ধরে পূঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থা চালু রাখছেন দেশে। কলম কিংবা বন্দুক, কিতাব কিংবা খেতাব সবটাই পণ্য হয়ে গেছে।

পৃথিবীর জিভে ক্ষত, নৈতিক সংকট, অস্থিরতা:

 

First genetically modified children were born on November, 2018! এটা খুবই বিস্ময়! মানুষ জীবনের মর্মমূলে হাত দিতে সক্ষম। টেস্ট টিউব বেবি, জেনেটিক বেবি, অধিক ফলনশীল শস্য সবটা বিস্ময়কর। তবু মানুষ কি আজও হৃদয় ছুঁতে পেলো? আলোয় উদ্ভাসিত পৃথিবী। অথচ আত্মহত্যার লাইন ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে। সভ্যতা এগিয়েছে পোশাকে। ভেতরে ভেতরে এসেছে নগ্নতা। ওপেন সেক্স, ড্রাগ, ব্রোকেন ফ্যামিলি, সমকামী কোন নিক্তিতে এগুলো বৈধতার লাইসেন্স পেতে পারে? তবুও পেয়ে যাচ্ছে। এখানেই কথিত গণতন্ত্রের গলদ। মন্দটা আইডেন্টিফাই করা গেলেও সাংখ্যিক জোরে থামানো যায় না। Nation is in sleeping pils and sex disease. পৃথিবীর জিভে ক্ষত। জীবনের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না আজকাল। কাশ্মীর, ফিলিস্তিন তো পৃথিবীর জৈবিক জিভে ক্ষত হয়ে সেই কবে থেকে জিইয়ে আছে।

জলবায়ুর পরিবর্তন, জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিবাদ সমেত পৃথিবী মৃত্যু শয্যায়:

 

১৯৫০ সালে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের যাত্রা শুরু। একবিংশের সাথে সাথে যাত্রা করেছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। জাতীয়তাবাদের মন্ত্র পাঠে পৃথিবীতে মানুষ একদিন ভেঙেছে পরাধীনতার শিকল। জন্ম দিয়েছে নয়া শৃঙ্খলার। পুঁজিবাদও একদিন পৃথিবীকে নিয়ে বিকাশের পথে হেঁটেছে। শৃঙ্খলা পুরনো হয়ে গেলে সেটা আবার শিকল হয়ে যায়। জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিবাদ দুটোই আজ পায়ের শিকল। মানুষের বিকাশ ও ভালো থাকার অন্তরায়। এ দুই ব্যাকডেটেড মন্ত্র হাতে নিয়েই কতিপয় চালাচ্ছে পৃথিবীর উপর বর্বরোচিত বলাৎকার।  মাটি মুখ বুঝে সইতে পারে, জলবায়ু বড্ড জেদী। নিজেকে পাল্টে নিয়ে সে আজ বিপন্ন করে দিচ্ছে পৃথিবীর মানব জীবন। ভাইরাস থেকে ভূমিকম্প সবটা নিয়েই প্রকৃতি খড়গহস্ত। নতুন নতুন মহামারী আর পিছু ছাড়ছেনা।

পৃথিবী বিনির্মানের আহবান:

 

কে জানতো বসন্তের আগুনে পুড়বে নিউইয়র্ক! সেই টুইন টাওয়ার। দুই দশক পূর্বের কথা। দুই দশকের প্রান্তে এসে আঘাত হানলো করোনা। অথচ সেদিনের মতোন আজও মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের প্রস্তুতি চলছিলো। দুই দশক পূর্ব হতে পরিণতির দিকে পৃথিবীর যে যাত্রা আজ যেন তা পূর্ণ হলো। সেদিনের আংশিক থ্রেট খাওয়া পৃথিবী আজ একঘর, একাকার। প্রাযুক্তিক বিকাশে বিশ্ব আজ গাঁয়ের চেয়েও ছোট।

প্রাযুক্তিক বিকাশে এটা আজ স্পষ্ট সমগ্র মানুষের জন্য একটিই পৃথিবী, লাব্ববাইক কন্ঠের অধিকারী শুধুই মানুষ, নষ্টকে নষ্ট বলার বোধ কিংবা মানিনা বলতে পারা অথবা সুন্দরকে ধারন করা বা নতুনকে মেনে চলার সক্ষমতা শুধুই মানুষের।

নষ্ট সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার দায় কিংবা যথার্থ সূর্যটাকে খুঁজে এনে ভোর উঠাবার বীরত্ব শুধুই মানুষের।

ভালোটা তরঙ্গ হয়ে ছুঁয়ে যায় সমগ্র ভুবন, তেমনি মন্দটা বিষ হয়ে বিষিয়ে দেয় সবার যাপন। বেঁচে থাকার বা বাঁচিয়ে রাখার একটিই কিশতি আজ, ভালো বা মন্দ সবটা সবার সাথে একাকার।

মহাবিশ্বের এই সবুজ কিশতিতে অখন্ড মানবিক বোধে আমরা হয়ে উঠি একজন- ইউনিটি অব ম্যান। প্রত্যহ খুঁজে আনি যথার্থ সুন্দর, যথার্থ সূর্য সকাল।

১৩.০৭.২০২০

Wednesday, July 8, 2020

নতুন সকালের প্রতীক্ষায় ( পার্ট - ২) - মোঃ শামীম রেজা

[নোট : "নতুন সকালের প্রতীক্ষায়" লিখাটি দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। সম্মানিত পাঠকদের অনুরোধ পার্ট - ২ পড়ার পূর্বে পার্ট - ১ পড়ে নিবেন]

এ্যাডাম স্মিথের আগে বণিকবাদী অর্থনীতির  যে রাষ্ট্রীয়  দর্শন ছিল তার উপর দাঁড়িয়ে গোটা ইউরোপ তাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতি গ্রহন করেছিল এবং সেই মোতাবেক কার্যাবলী পরিচালনা করতো। এমনকি মোটা দাগে বলতে গেলে নয়া সাম্রাজ্যবাদ নীতিতে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরেও এই প্রক্রিয়া চালু ছিল এবং বাজার দখলের নীতিতে সেই সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিই বহমান, মূলগত অর্থে বহাল আছে।

বণিকবাদী অর্থনীতির দর্শন ছিল নিজ দেশের উৎপাদিত পণ্য অন্য দেশে রপ্তানি করতে হবে সর্বোচ্চ মাত্রায় আর আমদানি হবে সর্বনিম্ন মাত্রায় সম্ভব হলে একেবারে আমদানি না করা ।

সেখান থেকে ইউরোপের দেশগুলো ছড়িয়ে পরে আফ্রিকা এবং এশিয়া সহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে। বাণিজ্যের নামে ধূর্ততা, দস্যূবৃত্তি,চৌর্যবৃত্তি কি করে নাই তারা? এ ইতিহাস খুব বেশি দিন আগের নয়।

১৭৭৬ সালে এ্যাডাম স্মিথের ওয়েলথ অফ ন্যাশন বইটা প্রকাশিত হয়। এই বই এ এ্যাডাম স্মিথ শুধু অর্থনৈতিক নতুন তত্ত্বের কথা ই বললেন না বরং উৎপাদন পদ্ধতি, সম্পদের মালিকানা ব্যবস্থা, সম্পদ বন্টন ব্যবস্থা, উৎপাদন সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সহ বিনিময়, বাজার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের বিনিময় সম্পর্কের ধরণ ইত্যাদির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলেন এবং অর্থনীতির ভিত্তি কৃষি থেকে সরিয়ে শিল্পের উপর দাড় করানোর কথা বললেন। তার অদৃশ্য হাত এখনও বাজার ব্যবস্থায় চালান হচ্ছে!

১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব হয় সাম্য,মৈত্রী ও স্বাধীনতা এই তিন মূলমন্ত্র কে আধেয় করে। রাষ্ট্রীয় পরিচালনা পদ্ধতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সহ টোটাল সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটা পরিবর্তন এলো।
প্রযুক্তির উন্নয়নে উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল এসময়।

এদিকে ভারতবর্ষে তখন কি ঘটতেছিল? যেখানে ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব হয়ে গেল ইউরোপে এবং কৃষককে মুক্ত করে দেওয়া হলো ভূমিদাসত্ব থেকে সেখানে ভারতবর্ষে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তন করা হয়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কতটুকু দেশজ বাস্তবতার নিরিখে হতে পেরেছিল? এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পর্কটা কি বৈশ্বিকভাবে ইতিবাচক ছিল?

এরপর বাংলাদেশ নামক যে ভূ-খন্ড রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত হলো তার উন্নয়ন ভাবনা, নীতি দেশজ বাস্তবতা পেয়েছে কিনা সেটা কেন্দ্র থেকে গ্রহন করা নীতি সমূহ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের জীবনে কতটুকু ইতিবাচক  প্রভাব রাখতে পেরেছে তা পরিসংখ্যান বলবে বিশেষত সমসাময়িক সময়ে পৃথিবীর আরো কিছু রাষ্ট্রের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের অগ্রগতি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে সে সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠে।

এখন বৈশ্বিকভাবে ৪ র্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলা হচ্ছে।। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের বেশ কিছু প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে যেমন
- ২০২৫ সাল নাগাদ ১০০ বিলিয়ন সংযোগ তৈরির সম্ভাবনা

- অটোমেশনের কারণে চাকরির ঝুঁকি বাড়বে (যুক্তরাষ্ট্র: ৩৮% – ৪৭%, জার্মানি: ৩৫%, ব্রিটেন: ৩০%, জাপান: ২১%)

এর বাইরে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের কিছু চ্যালেঞ্জ এর কথা বলা হচ্ছে-

- তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ

- প্রযুক্তিগত সমস্যায় উৎপাদনে ব্যাঘাত

- ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা

- ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে অব্যাহত সংযোগ নিশ্চিত

অটোমেশনের কারণে বহু মানুষের কাজের সুযোগ হ্রাস
৪র্থ শিল্প বিপ্লবের যেসব সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে

- অটোমেশনের প্রভাবে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি হ্রাস

- উৎপাদন শিল্পে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি

- স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে বড় পরিবর্তন

- বিশেষায়িত পেশার চাহিদা বৃদ্ধি

- সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন

বাংলাদেশ আসলে কোন পথে হাটছে? করোনা পরিস্থিতি ৪র্থ শিল্প-বিপ্লবকে আরো বেশি শক্তিশালি করেছে এবং ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের যে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিণতি (যা উৎপাদন ব্যবস্থার আল্টিমেট পরিণতিও বটে) ঘটার কথা বলা হচ্ছিলো সেটাই করোনা পরিস্থিতি দ্রুত বাস্তবায়ন করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ দীর্ঘ উপনিবেশ শাসিত দেশ হওয়ায় এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিক চিন্তা কাঠামো চিন্তা পদ্ধতি এখনও উপনিবেশের ভূত দ্বারা পরিচালিত হয়।

উদ্ভূত এই বৈশ্বিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতে বাংলাদেশের হাতে কি কোন নিজস্ব তত্ত্ব বা কাঠামো আছে যা এদেশ এবং দিশাহীন হয়ে পড়া নেতৃত্বহীন দুনিয়ার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিশা দেখাতে পারে?

কোন শর্তেই পৃথিবীকে আর বিভক্ত করা যাবে না
কোন অর্থেই মানুষকে আর উচু-নিচু ভেদে বিচার করা যাবে না।

বাংলাদেশকে এর প্রস্তুতিটা নিতে হবে যথাযথ ভাবে। দুনিয়াতে মারনাস্ত্র দিয়ে শাসন করার যুগ শেষ অথবা জাতীয়বাদ বা বৈশ্বিকতাবাদের যে উদারবাদী তত্ত্ব জ্ঞানকান্ডের সে ডিসকোর্সও সেকেলে হয়ে গেছে লকডাউনের এই কয় মাসে।

সুতরাং

প্রস্তুতি এবং প্রতিরক্ষার জায়গাটা হলো এখন জ্ঞানচর্চার জায়গাতে। এজন্য রাজনীতিটা সুস্থ এবং জনগন মুখি হয়ে দেশজ বাস্তবতায় হওয়া দরকার। ইউরোপীয় আলোকায়নের জ্যোতি আমাদের যৌথ জীবনের যে মৌলিক মানবিকতা বোধের শিকড় তা উৎপাটন করে ব্যক্তিবোধের ঘৃণ্য পারস্পারিকতাহীন অসামাজিক দায়হীনতার বোধকে সেঁটে দিয়েছে বাজারী ভোগ-বিলাসীতার প্রবৃত্তি দিয়ে। এখান থেকে শিক্ষা-জ্ঞান-মানবিক চর্চার এই এ্যাকাডেমিক মূল্যবোধ থেকে বের না হতে পারলে আমাদের সামগ্রিক মুক্তি নেই। আর ইউরোপ তো ইতিমধ্যে জীবন এবং জগতের সম্পর্ক নির্ণয়ে বস্তুতে গিয়ে থেমে আছে। তাদের ও বের হওয়া প্রয়োজন এই জট থেকে।

৪র্থ শিল্প বিপ্লব হোক নতুন মানবিকতার স্লোগানে
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ হোক উন্নয়নের শর্তে সর্বাগ্রে বিবেচিত। করোনার এই মহামারি বিশ্ব নেতৃত্বকে, মানচিত্রিক সীমানায় রাষ্ট্র গুলোকে এবং বৃহত্তর সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সমূহকে তেমন শিক্ষাই দিয়ে যাক বিশ্বের এই অহিংস ভাইরাসঘটিত মৃত্যুগুলো। পৃথিবী করোনা পূর্ববর্তী মানবিকতা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আরো উন্নত মানবিকতার স্তরে প্রবেশ করুক। নতুন সকালের প্রতীক্ষায়।

নতুন সকালের প্রতীক্ষায় ( পার্ট - ১) - মোঃ শামীম রেজা


রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ধারণায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বাজার নীতির মডেল অনুসরণ করে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকে যে চলক গুলো শক্তিশালী হিসেবে দেখা যায় সেখানে এদেশের সামাজিক এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নে ইতিবাচক কোন নীতি আদৌ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা সেটা স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পর এসে হিসেব করলে বেরিয়ে আসবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে উন্নয়নে সামিল হতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হয় এবং সেই পরিকল্পনাকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজন হয় সময়োচিত দূরদর্শীতা আর বিষয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা। সে অর্থে ১ম, ২য়,৩য় শিল্প বিপ্লব হয়ে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবে পৃথিবী। শিল্প বিপ্লবের এই স্তরায়ন শিল্পবাদী কারখানা তাত্ত্বিকেরা করেছেন যেখানে প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক ক্রিয়ার অনুবর্তী হিসেবেই কেবল বিবেচনা করা হয়।  প্রযুক্তির এই অভিঘাতে মানুষের সাংষ্কৃতিক পরিস্থিতির অবস্থা কিরূপ প্রভাবিত হয় এবং সেই প্রভাব সার্বজনীন মানবিকতার নিক্তিতে কতটা মানবিক সেটা দেখার ও কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ধারণা গোটা পৃথিবীর সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অন্য এক স্তরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। এখানে প্রযুক্তির যে বিষয়গুলো  উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করার বিষয় নিয়ে কাজ চলছে সেগুলো হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং,
উন্নতমানের রোবোটিক্স ও অটোমেশন, ইন্টারনেট অফ থিংস, ব্লক চেইন প্রযুক্তি, থ্রি-ডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, উন্নত মানের জিন প্রযুক্তি, নতুন ধরনের শক্তি।

বৈশ্বিক রাজনীতির ডিলটা আসে অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে।  সে অর্থে গোটা মানব বিশ্বকে তিনটা জাত অংশে দেখা যেতে পারে ১. রাষ্ট্র ২. জনগন ৩. ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

রাষ্ট্র জনগনের জাগতিক জীবনের সামগ্রিক কল্যাণার্থে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান যা ধারাবাহিক ক্রম ব্যবস্থাপনার সচেতন পরিবর্তনীয় মানুষের প্রয়াস। সে অর্থে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা থাকে সেটা যথাযথ প্রয়োগ হওয়া না হওয়া এখানে অপ্রাসঙ্গিক। ব্যবসায়ের যে ধারণা সেখানে মুনাফা একমাত্র মানদন্ড। ব্যবসায়ের প্রয়োজনে মানুষের মধ্যে ঔ ব্যবসায়ের পণ্যসমূহকে জায়েজ করার জন্য প্রতিষ্ঠান গুলো মানুষের ভৌগোলিক সীমানায় যতরকম সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রয়েছে তার সবগুলোকে কাজে লাগায়। আপনার ধর্ম, সংস্কৃতি সব ঠিক আছে এগুলো র সাথে শুধু আমাদের পণ্যগুলো যোগ করে নিন তাহলে আপনাদের ধর্ম, সংস্কৃতি অধিক মাত্রায় উদ্ধার হয়ে যাবে। এই বোধে উত্তীর্ণ শিক্ষিত জনগন খুব দ্রুতই বিভক্ত হয়ে যায় ভোগবাদীতার নিক্তিতে।

প্রান্তিক হয়ে পড়া এই অসভ্য প্রতিযোগীতার বাইরে থাকা ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠি সহ যারা এর বাইরে থাকতে চেয়েছে এই বাণিজ্যিক আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চেয়েছে তাদের এই বর্বর সওদাগরি সভ্যতা অনাধুনিক বা অসভ্য তকমা দিয়েছে।

অখন্ডায়নের এই যুগে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সভ্যতা-সংস্কৃতির মান বিচার এর ব্যতিক্রম হয়নি বিশেষত উপননিবেশিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার দরুণ তা বেশ মজবুত হয়ে আছে শহুরে শিক্ষিত সমাজে। এতদ  বিচারে জনগনের সাথে রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে জনগনের সম্পর্কটা প্রকৃত অর্থে কেমন এবং এই তিনের মিথস্ক্রিয়ায় সংস্কৃতি-সভ্যতার গতি সেই গতির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কার হাতে বেশি, কেন বেশি, বেশি হওয়ার দরুণ কি ঘটে সমাজে সেগুলো নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিল্প-বিপ্লবের কোন পণ্য আমরা শিল্পায়িত করবো নাকি আমরা পণ্য হয়ে উঠবো?

উন্নয়ন সূচকের গজকাঠি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্মুখীনতাকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে নির্দেশ করে। তো কল্যাণ রাষ্ট্র বা উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র যাই হোক না কেন দেশজ অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারনের সাথে সাথে বৈশ্বিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ডিলিংসটাও করতে হয়। এর সাথে জড়িয়ে থাকে সাধারন মানুষের জীবন। ধর্ম, শিক্ষা, আচার, প্রথা ইত্যাদি;
যেগুলো মানুষের জ্ঞান চর্চার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

প্রতিষ্ঠান হিসেবে "রাষ্ট্র" ব্যবস্থাপনার কাজ করছে রাজনৈতিক মানচিত্রের সীমানায় এবং অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন চুক্তি-বিনিময় করে। রাষ্ট্রের এই প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক চরিত্র একরকম হওয়ার কথা নয় উদ্দেশ্যগত ভিন্নতার কারণেই। রাষ্ট্র যদি মানবিক সূচকগুলোকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই (যা আল্টিমেটলি উন্নয়ন সূচকগুলোর সাথেই সম্পর্কযুক্ত) ব্যক্তির ভিতরেও সেই প্রচেষ্টার অঙ্কুর থাকার কথা।

প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান-চর্চার প্রায় সবগুলো মাধ্যম রাষ্ট্রের জীম্মায়। কিন্তু ব্যক্তি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতই আত্ম-অর্থ-উন্নয়নের মডেলে চলার প্রবণতায় থাকার দরুণ তার অর্জিত সকল জ্ঞান প্রয়োগ হচ্ছে ঔ জায়গাতে।

(প্রশ্ন হলো সেটা কিভাবে হতে পারে? কেন এমনটা ঘটে? সম্পদ মালিকানা ব্যবস্থাপনাগত কারণ? এগুলো কি দেশের ইন্টেলেকচুয়াল এবং রাজনীতিবিদরা বোঝেন না?)
তখন অর্জিত জ্ঞানের সমস্ত ইথিকস-মরালিটি একটা গাজকাঠি দ্বারা জাস্টিফাইড হচ্ছে "আপনি বাঁচলে বাপের নাম"। সে অর্থে সভ্যতার অগ্রযাত্রায় জ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে কিন্তু তার প্রবণতা আদতে  কোনদিকে ধাবিত হয়েছে? উন্নয়ন যাই ঘটুক না কেন তা ব্যক্তির জ্ঞানের সাথে যদি মানবিকতাকে আধেয় না করতে পারে সেই জ্ঞান দানবীয় বা আসুরিক হয়ে উঠবে।
আর সেই উন্নয়ন অতি দ্রুত অরাজকতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনীতি আর অর্থনীতির এই রসায়নটা মার্কেটিং পলিসি সবচাইতে ভালো বোঝে এবং বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শর্তগত কারণেই বৈশ্বিক রাজনৈতিক (বিশেষ করে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে) ক্ষেত্রে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন সেটা তাদের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারে না।

চলমান...
০৭.০৭.২০২০