Monday, October 5, 2020

আপনি হয়ে উঠুন একবিংশের ধাত্রী - ভূবন মুন্সী।



আপনি হয়ে উঠুন একবিংশের ধাত্রী



"থাকো দেশে অথচ গীত গাও নাঙের " প্রবাদ প্রতিম বাক্যটি অধিক স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন মগজটা স্বদেশের না হয়ে - হয়ে উঠে ভিনদেশের । আর মগজ স্বদেশের হয়ে ওঠে অর্থাৎ যথাযথ স্বকীয় স্বদেশ বোধ গড়ে ওঠে যাঁদের নিপুণ কারিগরি সংগ্রামে ও দক্ষতায় তাঁরা বুদ্ধিজীবি । তাঁদের প্রচেষ্টায় বোধের ক্রিয়াতে জাগ্রত হয় প্রতিটি মানুষ । আর একাত্তরে বিজয় নিশ্চিত জেনেও বিরোধী শক্তি সুকৌশলে নিকেষ করে এদেশের বুদ্ধিজীবি শ্রেণীকে। আমাদের তৈরি হয় চেতনাগত পুঙ্গুত্বের পথ।

একাত্তরে রক্তদামে আমরা যেন কিনেছি চশমার স্বদেশী ফ্রেম, লেন্সদ্বয় এখানো রয়ে গেছে ভিনদেশীয় । ফলে স্বদেশ কে স্বদেশের মতো করে আজও দেখা হয় নি - দেশটা হয়ে ওঠেনি দেশবাসীর ; সেই সাথে বীর সেনানী শহীদ বুদ্ধিজীবি থেকে গেছে যথাযথ স্মরণ-শ্রদ্ধা ও ইতিহাসের অন্তরালে, দেশজ চেতনাহীন দেশটাও এগিয়ে যায়নি আপন কক্ষপথে । দেশ এগিয়ে যাওয়ার শর্তে স্বদেশ বোধ যেমন জরুরী তেমনি এর শুরুটা হবে বোধ জাগানিয়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ।

জৈবিক চোখ থাকলেও বৌদ্ধিক চোখের অন্ধত্বে দেখা হয়ে ওঠেনি দ্রষ্টব্য। অতএব, বৌদ্ধিক চোখের ভাঁজ খোল "রাষ্ট্রীক ঠাকুর"।

বোধিবৃক্ষসম শহিদ বুদ্ধিজীবিদের শূণ্যতা পূরনে, আজকের এই বৌদ্ধিক সংকটে কান্ডারীর ভূমিকা পালনের রাজসিক প্রত্যয়ে তারুণ্যের পক্ষ থেকে আপনি হয়ে উঠুন একবিংশের ধাত্রী।

দোকান


আরও পড়ুন

Thursday, September 17, 2020

এবং সত্য কথা - এম ইকবাল।

মেসেঞ্জারঅবকসমোলজি



সত্য কথার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে- তুমি কাউকে সবসময় খুশি রাখতে পারবে না যদি সে সত্যের অনুসন্ধানী না হয়।


আমাদের সমাজটাই যেহেতু মিথ্যা আর পঙ্কিলতায় ডুবে আছে তাই আমাদের সবার জীবনে মিথ্যা-ই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।

আমাদের সমাজ যে মিথ্যা, অনাচার, অন্যায় আর পঙ্কিলতায় ডুবে আছে চারপাশে তাকালে এটা যে কেউ বুঝতে পারে। তবুও আমরা সবাই মনে করি নিজে যা করছি ঠিকই তো করছি। সেটাকেই আমরা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ভেবে মেনে চলছি।

কোন এক সময়ে এগিয়ে যাওয়ার শর্তে পূজিবাদী দর্শনকে পৃথিবী গ্রহন করলেও তা আজ কিছু মানুষের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। শিল্প, প্রযুক্তি আর মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশ হতে হতে আজ তা দানবে পরিনত হয়েছে। অল্প কিছু মানুষের হাতে চলে এসেছে পৃথিবীর অর্ধেক সম্পত্তি।

বলা হচ্ছে, পৃথিবীর ১ ভাগ মানুষের কাছে পৃথিবীর ৯৯ ভাগ সম্পত্তি চলে এসেছে। অন্যদিকে ৯৯ ভাগ মানুষের হাতে থাকে মোট সম্পত্তির ১ শতাংশ। আর এই ১ শতাংশের মধ্যে থেকে আমরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগীতায় কামড়া কামড়িতে ব্যস্ত। এদিকে আর্থিক মানদন্ডই সমাজের মুল মানদন্ড হয়ে উঠেছে। 

এই মানদন্ডে কে বড় কে ছোট হলাম এই হিসেব করতেই আমাদের জীবন কেটে যায়। একে অপরকে হেয় করতে, অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করতে প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে বিভেদ করে চলছি। এই বিভেদ করার কূটকৌশল ও শিক্ষানীতি সমাজে তারাই জারি রেখেছে, যাদের হাতে বেশিরভাগ সম্পত্তি বন্দি হয়ে আছে। একদিকে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালছে সমাজের চলমান দৃষ্টিভঙ্গি টিকিয়ে রাখতে আর অন্যদিকে শিক্ষাখাতে যথাযথ মান বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ করতে সরকারকে বাধা দিচ্ছে।

অথচ এই নীতি চলমান থাকলে পৃথিবীর ৯৯ ভাগ সম্পত্তিই অচিরেই হাতেগোনা কিছু পুজিপতিদের হাতে চলে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তারা চাইলেই এটা করতে পারে। ফলে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে, ঋণগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে, কর্মহীন বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকবে, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই বাড়তে থাকবে, সামাজিক বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করবে, পূজিপতিরা নতুন নতুন ফর্মূলা এনে দাড় করাবে মানুষের সামনে- মুখের সামনে মুলো ঝুলানোর মত, সর্বোপরি মানুষ কৃতদাসের চেয়েও মূল্যহীন হয়ে পড়বে। পূজিপতিদের দয়া, দান-খয়রাত আর ঋণকার্যক্রম হয়ে উঠবে সাধারণদের বাঁচার একমাত্র মাধ্যম।

একদিকে চলবে কিছু মানুষের বিলাসবহুল জীবনযাপন অপরদিকে দেশজুড়ে চলবে অসহায় মানুষের আর্তনাদ। এমতাবস্থায় বার বার দূর্ভিক্ষ, মহামারী হতেই থাকবে। এগুলোই মানব সৃষ্ট বা কৃত্রিম দূর্যোগ। অথচ পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যক্তির হাতে সম্পত্তি কুক্ষিগত হওয়ার এই পথ খোলা রেখেছে। এভাবে যতখুশি সম্পত্তি অর্জন করা বর্তমান ব্যবস্থায় বৈধ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

কথাটাকে এভাবও বলা যেতে পারে, নিজ মেধা, শ্রম, যোগ্যতায় কোনো মানুষ যদি সারা পৃথিবীর সকল সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়, আর বাকি সমস্ত মানুষ যদি ভুমিহীন, সম্পত্তিহীন, খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন হয়ে যায়, এমনকি অসুস্থ হয়ে মারাও যায় তাতেও ভু-সম্পত্তির মালিককে দায়ী করা যাবে না। সে চাইলে তার সমস্ত সম্পত্তি অনাবাদী রাখতে পারে, তার সমস্ত অর্থ মাটির তলায় জমা করতে পারে, কোনো মানুষকেই তার সম্পত্তির ভাগ নাও দিতে পারে তবুও সে আইনত বৈধ।

পৃথিবীর বর্তমান ব্যবস্থায় তাকে দোষী বলার কোনো সুযোগ নেই। সত্যিকার অর্থেই আমরা এমন একটা ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি এবং এর জন্য অনেকটা আমরাই দায়ী। নিজের ঘাড়ে সমস্যার বোঝা না চাপলে এর তীব্রতা কেউ অনুভব করি না। যেন নিজে বাঁচলেই সব সমস্যা শেষ। চারপাশের সংকটকে নিজের সংকট হিসেবে ভাবতে চাই না তবে চারপাশে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চাই ঠিকই। আমাদের এই চরিত্রটাও চলমান ব্যবস্থার ফল। আমাদের চরিত্রটা এই চলমান ব্যবস্থার মতোই স্বার্থান্ধ, মিথ্যা আর অমানবিক।

আসলে মানুষের জন্য বর্তমান পৃথিবীর চলমান ব্যবস্থাটাই অবৈধ হয়ে পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দরকার নূতন ব্যবস্থা।

সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জীবনের জন্য এত বড় নির্মম সত্য সামনে চলে আসলেও আমরা সত্যকে একপাশে ঠেলে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জীবনকেই সত্য থেকে বহুদূরে ঠেলে দিয়েছি। তাই সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও জীবনের সাথে সত্যের সম্পর্ক না থাকার জন্য সত্যকে ঠিকমতো চেনা হয় না, জানা হয় না, উপলব্ধি করা হয় না। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোন কথা যদি আমার ফেবারে থাকে তবে তা আমরা সত্য বলে মেনে নেই, খুশি হই, আর ফেবারে না থাকলে তা মিথ্যা বলে ছুড়ে ফেলি, অখুশি হই।

তাই কাউকে খুশি করার উদ্দেশ্য নিয়ে সত্যের সাথে থাকা যায় না। সত্যের সাথে থাকতে হলে নির্মোহ হতে হয়। সত্যের অনুসন্ধান করতে হয় জীবন ও জগৎকে সঠিকভাবে চেনার জন্য, উপলব্ধি করার জন্য, চিন্তা, লক্ষ্য ও কর্মে জগতের সাথে জীবনের ঐক্যতা স্থাপনের জন্য, প্রকৃতির সকল উপাদানের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে ভালো থাকার জন্যে, নিজে ভালো থেকে সবাইকে ভালো রাখার জন্য।

আপডেট পেতে পেইজএ লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।



Friday, August 21, 2020

মোহাম্মদ মমিনের কবিতা গুচ্ছ || ভোরের বিদ্রোহী ঠোঁট।

কবি চেয়ে দেখেন- ভালোবাসার অভাবে এখনো অপূর্ণ মানুষ কিংবা হিংসার খেয়ালে ইতিহাস আজ অনেক ছোট। কবি সেকেলে হয়ে ওঠা জাতীয়তাবাদের বাইরে গিয়ে খোঁজতে চেয়েছেন নিজেকে, পেতে চেয়েছেন নিজের ও সামগ্রিকতার মুক্তি। নিঃশ্বাসে আজ মৃত্যুর গন্ধ। তাই কবি দেবতার পায়ে চুমু, কৃষ্ণচূড়ার ঠোঁটে চুমো দিয়ে নিজের ইচ্ছাকে ব্যক্ত করেন; পেতে চান মুক্তি, শান্তি, ভালোবাসা।

উৎসর্গ    : ভূবন মুন্সী কে।
প্রকাশক : মেসেঞ্জার অব কসমোলজি।
প্রকাশ    : আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ।
স্বত্ব         : মেসেঞ্জার অব কসমোলজি। 

 ভোরের বিদ্রোহী ঠোঁট

messenger of cosmology

 

সময়ের দাবি

আমাকে একটু শান্তি দাও,
দেবতার পায়ে চুমু, বলছি
আমাকে একটু শান্তি দাও।

নিঃশ্বাসে আজ মৃত্যুর গন্ধ।

অসভ্য সেই মানুষের মুখোশ
খুলে দাও তুমি
আমাকে একটু শান্তি দাও।

স্বপ্নের ঘরে ভগ্ন স্বপ্ন।

মেধা শূন্য মানচিত্র
ভেঙে দাও অচলতা
আমাকে একটু শান্তি দাও।

আকালে আজ জ্বলছে পৃথিবী,
আমাকে একটু জায়গা দাও।
দেবতার পায়ে চুমু, বলছি
আমাকে একটু শান্তি দাও।

জাতীয়তাবাদ

আজকের এই রজনীতে তুমি আমি একাকার
নবজন্ম হলো পৃথিবীর।

তবুও কি প্রয়োজন আছে
বর্ডার কিংবা কাটাতার?


আরও পড়ুন - একবিংশ শতাব্দীর দুই দশক 


২০২০

সময়ের কসম
পৃথিবী আজ অসহায়,
অসহায় আজ
যাঁরা প্রকৃত মানুষ।

রাজশ্রী

মাঝে মাঝে কলিজা পোড়ার গন্ধ পাই
সিগারেটের ধোঁয়া এখন অসহ্য লাগে

জেতার অভ্যাস ছেড়েছি সেই কবে
তাই হেরে যাবার ভয় তোমার নেই

মোহ আর মমতা জড়ানো আজ
জীবন কী কঠিন রাজশ্রী!

জাতক থেকে জন্মধাত্রী সবারই কলিজা
পুড়ছে আজ।
রাজশ্রী, তোমার কী কাজ?

আরও পড়ুন - সরকার জৈব ক্ষমতা দ্বারা জনগনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

শুভ্রতা

ভোর বেলার বিদ্রোহী ঠোঁট
দুপুরের কড়া রোদে
সিগারেটের ধোঁয়ায় কালো
সমাপ্তি হলো জীবনের
এপাড় ওপাড়।
তবুও কি বাঁশি বাজবে
গাইবে গান পাখি নতুন সুরে
একাট্টা হয়ে সাজাবে সমাজ
পৃথিবী নতুন?
তুমি কী গাইবে ভোরের পাখি?

অভিন্ন ফটোগ্রাফ

চলোনা একে অপরের কান্না মুছে দেই
কৃষ্ণচুরার ঠোঁটে চুমো দিয়ে বলি
পৃথিবীটা আমাদের

চলোনা একই সুরে গাই গান
ভাঙা সীমান্ত প্রাচীরে মুক্ত করি পাখি
একতারাতে একতাল দেই দুজনার তর্জনীতে
দুটি তুলিতে আঁকি একটি ফটোগ্রাফ

চলোনা সামাজিক মানুষ হওয়ায় প্রত্যয়ে
কিছুটা পথ হাঁটি
দেখি আগামীটাকে একান্ত নিজের চোখে। 

আরও পড়ুন - বেকারত্ব ও পরিবর্তনীয় ভবিষ্যতের হাতছানি।

ভালোবাসা পেলে বেঁচে থাকি

পানি তুমি কোথায় একটু চোখে আসো
ভালোবাসা তুমি কোথায় একটু কাছে আসো।

ব্যক্তিক চাওয়া পাওয়ার কাছে
বৌদ্ধিক চোখ গুলো এই আকালে ঘুমিয়ে আছে
মানবতা বলে কিছু নেই, মর্যাদা বলে কিছু নেই

হিংসার খেয়ালে ইতিহাস আজ অনেক ছোট।

এক থেকে একাধিক ভাবাটাই ভুলে গেছি আমরা
বুকের খাপটা খুলে একবারও দেখিনা আজ
অথচ বুকের ক্ষত নিয়ে মাঝে মাঝে চমকে উঠি

চেয়ে দেখি

ভালোবাসার অভাবে এখনো অপূর্ণ মানুষ।

অগোছালো জীবন যাপন

দিন শেষে স্বার্থের লেজ আর বেহায়া
উন্মাদনা, আত্মহত্যার চেয়ে জঘন্য আমি বারবার
বেঁচে থাকি।
নিজের হাতে তুলে নিয়েছি ধ্বংসের মরচে পড়া অস্ত্র,
প্রতিনিয়ত মৃত্যু হয় আমার চেতনার অভাবে।

জাল্লাদি চোখে লালসার দৃষ্টি আঁচড় করে আমার গায়ে, সময়ের ব্যবধানে যুদ্ধে যাবার ছেলেটা হারিয়েছে
তার মনুষ্যত্ব।
নিজের কামনার দৃষ্টি মায়ের উপর, জন্মভুমি আজ অসহায়, অসহায় আজ কিছু নটির দালালের কাছে।

একাত্তর থেকে আজ-অব্দি পুরনো ঘেঁউ ঘেঁউ,
সন্ধ্যা হলে নেমে আসে অন্ধকার।
কোথায় পাবো মুক্তি, এই অগোছালো জীবন যাপনে
কে দেবে আমায় মুক্তি আমার?

 

আরও পড়ুন

ভূবন মুন্সীর কবিতা গুচ্ছ 

লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুনঃ 

মেসেঞ্জার অব কসমোলজি পেইজ এ 

মেইল করুনঃ 

shimul2016.bsm@gmail.com

Tuesday, August 18, 2020

মনরে কৃষি কাজ জানো না - মোঃ শামীম রেজা।



   

মোঃ শামীম রেজা
 

মনরে কৃষি কাজ জানো না


প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের শিক্ষা পদ্ধতি ছিল গুরুগৃহ কেন্দ্রীক। শিক্ষার্থীরা গুরুর আশ্রমে দীর্ঘদিন থাকতো এবং গুরু শিক্ষার্থীদের জীবন-যাপন থেকে শুরু করে প্রচলিত বিশেষায়িত বিষয় সমুহের উপর অধ্যায়ন করাতেন আগ্রহ এবং মেধা অনুসারে। ঔ সময়ের শিক্ষার ভিতর কৃষিকাজ হাতে কলমে শিক্ষা করা ছিল সব শিক্ষার্থীর জন্য অক্ষরজ্ঞান অর্জন করার মতই মৌলিক এবং বাধ্যতামূলক বিষয়। অক্ষর জ্ঞান প্রদানের সাথে সাথে তাদের প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা টুকরো জমি প্রদান করা হত এবং সেই জমিতে গুরুর নির্দেশ মত আবাদ করে ফসল ফলাতে হত।

এই শিক্ষা পদ্ধতির দরুন শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রথম পর্যায়েই নিজ দেশের মাটি-জল-আবহাওয়া সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হত এবং  অধীত বিষয়ের সাথে খুব সহজে তার দেশের মাটির সংযোগ স্থাপন এবং প্রয়োগ করতে পারতো। ভারতবর্ষে অপ্রায়োগিক/অপ্রয়োজনীয় জ্ঞানের চর্চা কখনো ছিল না। এর ফলে পান্ডিত্যের অসার -অহমিকা তৈরি হওয়ারও কোন সুযোগ থাকতো না বরং অর্জিত জ্ঞান কত বেশি মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায় সেটাই ছিল শিক্ষা অর্জনের মৌলিক উদ্দেশ্যগত দিক। খুব অবাক করা বিষয় হলো এদেশের অক্ষরজ্ঞানহীন জনসমাজের ভিতর এখনও বিলুপ্ত প্রায় এরকম বিশ্বাস টিকে আছে যে এদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ তাদের অন্ধকার ভাগ্যাকাশে কোন একদিন সূর্যের মত জ্বলে উঠবে। রাতের অন্ধকারে নিজের শেষ সম্বলটুকু ও বিলিয়ে দিয়ে কেউ কেউ দুঃসাহসে বলে ওঠে "আমরা ওদের প্রদ্বীপের তেল জোগাবো ওরা আমাদের আলো জোগাবে"।

শিক্ষা পদ্ধতির ধারাবাহিক ক্রম-বিবর্তন, সমাজ, রাষ্ট্র,বিজ্ঞান ইত্যাদি পরিবর্তন মারফত কালের ফেরে বর্তমানে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে করে বাংলাদেশের মত দীর্ঘ উপনিবেশ শাসিত দেশের ছেলেমেয়েরা সেই অর্থে নিজের আগ্রহই আবিষ্কার করতে পারে না, করতে পারলেও সে বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করার পথ বিভিন্ন কারণে সুগম্য হয় না, পড়ালেখা করতে পারলেও অধীত বিষয়ের জ্ঞান প্রয়োগে এ দেশের মাটি খুজে পায়না।

প্রসঙ্গান্তরে একটু ভিন্নবিষয়ের অবতারনা করতে হচ্ছে...

বাংলাদেশে ষাটের দশকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসাদের প্রায় সবাই ছিল তৎকালিন ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত জমিদার পরিবার থেকে উঠে আসা। ফলে বিপ্লব প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনীয়তা তাদের বোধে যতটুকু না ছিল বাস্তবিক তার চাইতে অনেক বেশি ছিল সোভিয়েত-চীন-ভিয়েতনাম-কিউবা র তাত্ত্বিক প্রতিফলন।

সামন্ত পরিবারের এই বিপ্লবীরা পারিবারিক ভাবে স্বচ্ছল থাকার কারণে শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে একই সাথে পুজিঁর চরিত্র্য এবং মালিকানার পরিবর্তন আসছে সেটাও বুঝতে পেরেছিলেন। ক্ষমতা এবং ঐতিহ্যের পাড়ায় তারা সর্বহারার স্লোগানের ভিতর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন। খুব সংকীর্নদৃষ্টিতে এমনটাই দেখা যায় অন্তত বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করতে গেলে। তবে সেটা ছিল এক ঐতিহাসিক পরিস্থিতি যা ঘটা ছিল অনিবার্য।


(আরও পড়ুন - শ্রী রীতির কবিতা গুচ্ছ)

 
এসব কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের কথায় বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ স্বাধীনতার পরও ঘর থেকে বের হয়ে গেছে সর্বহারাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তারা মার্ক্স, লেলিন, মাও সে তুং এর নাম মুখস্থ করতে শিখেছিল। তারা আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের গল্প রূপকথার মত বিভোর হয়ে শুনতে শিখেছিল সে সময়।

৯০ এর দশকে এসে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ধরনটা পাল্টে যেতে থাকে। সচেতনভাবে দেশে বিরাজনৈতিক চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করার আয়োজন চলে বিভিন্ন মাধ্যমে। যার ফলাফল একবিংশ শতকে এসে বাংলাদেশে তরুণদের ভিতর রাজনৈতিক এনার্কির বর্ধিত সংক্রমন।

কমিউনিস্ট নেতাদের বিপ্লবী আদর্শ এদেশের মাটি-জল-আবহাওয়া পেল না ফলে আদর্শিক শক্তির বিকৃত প্রকাশ ঘটার ইতিহাস আমাদের সবার জানা। পার্টি গুলোর ভিতর বিভাজন, শ্রেণী শত্রু খতমের নামে খুন-খারাপি বাড়তে থাকায় একসময় এদেশের মানুষের কাছে তারা গনবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিচিতি পেল।

শিক্ষার সীমাবদ্ধতা হলো তা জ্ঞাত অর্থে সার্বজনীন হলেও প্রয়োগ অর্থে দেশ-কাল-পাত্র শর্ত মুক্ত হতে পারে না। এই শর্তগত কারণেই শিক্ষা পদ্ধতির কাঠামো এবং বিষয় দেশ বা কালাত্তীর্ণ নয় বরং পুরোটা দেশজ ও কালিক হতে প্রয়োগগত কারণেই বাধ্য।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট বিপ্লবী বা উদার গণতান্ত্রিক ধোঁয়া তোলা শিক্ষিত সমাজের নেতারা এদেশের জনগনের উন্নয়নের জায়গাটা আদতে কোথায় তার শিকড়টাই অনুসন্ধান করার তাগিদ অনুভব করেনি বা করতে চাননি। (চাইলে নদী গুলোর এই অবস্থা হত না, বন জঙ্গল ধ্বংস করে প্রকৃতি পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাতো না, এ দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা বিদেশী কোম্পানি গুলোর নিকট জীম্মি হয়ে যেত না।)

এদেশের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় চলমান বিচার ব্যবস্থা, উৎপাদন-বন্টন তথা সাংস্কৃতিক বোধ সমাজকে পরিচালনা করার জন্য এবং সমাজ প্রগতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পরিবর্তিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার সাথে তা সমাজ দর্শন এবং রাজনৈতিক দর্শনের নিরিখে বিচার-প্রয়োগ করার কোন দায়ই কেউ নেয়নি।

যারা এসব একটু আধটু বোঝার চেষ্টা করে এরা রাজনীতি বিমূখ দায়হীন শুকনো জ্ঞানের হম্বি-তম্বি করে বেড়ানো বুদ্ধিজীবি গোছের আর যারা এসব বোঝেনা কিন্তু এটা বোঝে যে সমাজে ক্ষমতার উপযোগিতা কতটুকু আর সেই ক্ষমতার কেন্দ্র রাজনীতি দ্বারা আচ্ছাদিত। সুতরাং তাদের যেতে হয় ক্ষমতার চর্চা করতে রাজনীতিতে। পুজিঁর সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক যত সমান্তরাল হতে থাকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সাথে সাথে পুজিঁও কেন্দ্রীভূত হতে থাকে।

এদেশের জনগন কোন রাজনৈতিক নেতাকে বিশ্বাস করতে চাই না এমনকি শিক্ষিত শ্রেণী কেও তারা বিশ্বাস এবং সম্মান কোনটাই করে না। শহুরে বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষগুলো যে ধড়িবাজ তা তারা এখন বুঝে ফেলেছে। এই অবিশ্বাস আর হরিলুটের যুগে দু-একজন যে কর্ম-যোগী, জ্ঞান-যোগী নেই তা সর্বতোভাবে বলা যায় না।

এদেশের জন্য সত্যি সত্যি কিছু করতে হলে এদেশের নদী, মাটি, ফসল, বীজ, বন, পাহাড় বুঝতে হবে আগে। এসব বুঝতে হলে এসবের সাথে যাদের নাড়ীর সম্পর্ক তাদের বুঝতে হবে। দুর থেকে বই পড়ে  বোঝার ফলাফল পেয়ে আসছে এদেশ।  মাঠে নামলে হয়তো চেয়ারে বসে চুরি করার ইচ্ছেটা আর নাও থাকতে পারে। চোর বা রাজনীতিবিদ বা বিপ্লবী প্রথমে ভিন্ন হয় চেতনাবোধে তারপরে ভিন্ন বা সমগোত্রীয় হয় চেতনা  প্রয়োগে।

শুভ বোধের উন্মেষ ঘটুক এবং উন্মেষিত বোধ যথাযথ প্রয়োগের দিশা/কাঠামো পাক।

 আরও পড়ুন: শামীম রেজার...

সংগ্রামটা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে 

মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলের...

দেশীয় অর্থনীতি বনাম যোগান বিধি


 লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুনঃ

মেসেঞ্জার অব কসমোলজি পেইজ

মোঃ শামীম রেজা

মোঃ মাসুদ মিয়া 

শ্রী রীতি 

ভূবন মুন্সী

মেইল করুনঃ 

shimul2016.bsm@gmail.com

Monday, August 17, 2020

বৈরিতা নয়, চাই প্রকৃতি ও মানুষের সখ্যতা - একেএম খাদেমুল বাসার।



    বৈরিতা নয়, চাই প্রকৃতি ও মানুষের সখ্যতা

 লেখক


যে শহর সোডিয়াম নিয়নের আলোয় আলোকিত হয় সে শহর কি করে তার মুগ্ধতা  ছড়াতে পারবে? ইট-পাথরের  শহর কখনোই প্রকৃতি দিয়ে তার মুগ্ধতা ছড়াতে পারেনি, আগামীতেও পারবে কি না সন্দেহ রয়েছে। কৃত্রিমতা দিয়ে আর কতটুকুই বা করা যেতে পারে। সেজন্য আমি সব সময় গ্রাম্য এলাকা বা প্রকৃতি পছন্দ করি। সুনসান নীরবতা আর পাখির কোলাহলে মুখর এক অপার্থিব সুখ। দিনের আলো কমে যাবার সাথে সাথে আরেক সৌন্দর্য এসে হাজির। যেখানে জোৎস্নার সাথে আবার জোনাকির মিতালী। আর যদি প্রকৃতির মাঝ দিয়ে নদী বয়ে যায় তাহলে তো পুরাই সোনায় সোহাগা একটা ব্যাপার। নদীতে ঢেউয়ের শব্দ  বাড়তিমাত্রা যোগ করে।


(রুটার ব্রিগম্যানের এটা পরিবর্তনের সময়)


শহুরে জীবন আর গ্রামীণ জীবনের যে বিস্তর ফারাক তা কিন্তু চাইলে পুরোপুরি না হোক অনেকাংশে পরিবর্তন করা যেতে পারে। এতো এতো বিশাল অট্টালিকার ভিড়ে একটু ফাঁকা জায়গা পেলেই মানুষের মন আনন্দে নেচে উঠে আরেকটা অট্টালিকা তৈরির চিন্তায়। এই চিন্তাটা যদি একটু পরিবর্তন করা যেত তাহলে এই শহুরে জীবনে প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যেত। এ শহর যেমন মানুষদের রোবট বানিয়ে রেখেছে ঠিক সমানতালে অর্থ-বিত্তের এই ভয়ডরহীন খেলায়ও মাতিয়ে রেখেছে। যে খেলায় একেকটা মানুষ নিজেই তার প্রতিযোগী। এসব ভয়ডরহীন খেলায়  বলির শিকার হচ্ছে প্রকৃতিই। যে প্রকৃতি আমাদের জলবায়ু থেকে শুরু করে নানানকাজে  অবিরত সহায়তা করেই যায় তাকেই আমরা দূরে সরিয়ে দিচ্ছি অর্থ-বিত্তের নেশায় বুঁদ হয়ে।

আমরা চাইলে পারি মানুষের সাথে প্রকৃতির আগের সে শখ্যতা ফিরিয়ে আনতে। ইট-পাথরের এ শহরে দরকার শুধু একটু চিন্তাধারার পরিবর্তন। প্রতিটা মানুষ যদি তার নিজের মতো করে প্রকৃতিকে ভালবেসে তাদের নীড়ে ঠাঁই করে দেয় তাহলে অনায়াসেই সম্ভব এই অসাধ্যকে সাধন করা। মানুষ নাকি তার স্বপ্নের সমান বড়। যে শহরে বিভিন্ন দূষণে শ্বাস নিতেই এখন কষ্টকর হয়ে গেছে  সে শহরে মানুষ কতবড় স্বপ্ন দেখে তা আসলে আমার বোধোগম্য নেই। আমার কাছে এ শহরের মানুষের স্বপ্নগুলোকে আঁষাঢে বৃষ্টির মতো মনে হয়। একজনের থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেলেই যেন এরা খুশি। প্রকৃতির সাথে যদি সখ্যতাই গড়ে না উঠে তাহলে এসব করে কি লাভ?


(আরও পড়ুনঃ শ্রী রীতির কবিতা) 

 
শহুরের কোটি কোটি মানুষের মধ্যেও কিছু ভিন্ন ধাঁচের মানুষ রয়েছে যাদের মাধ্যমেই এই শহর প্রকৃতির ছোঁয়া পায়। তারাই হাটিঁ হাঁটি পা পা করে প্রকৃতিকে তাদের নিজের মতো করে গড়ে তুলছে। মনে হয় একজন মা যেন তার সন্তানকে যেন কোলে পিঠে মানুষ করছে। তাদের দেখেই আরো কিছু মানুষ যোগ হচ্ছে। শহুরে জীবনে তারা তাদের ঘরকে প্রকৃতির মাধ্যমে যেভাবে সাজিয়েছে তা আসলেই দেখার মতো।

আরও পড়ুনঃ পৃথিবী কোন পথে?

একটা বিল্ডিংয়ের ছাদকে অযাচিতভাবে ফেলে না রেখে সেখানে আপন মমতায় বৃক্ষরোপন করে পাখিদের অভয়ারণ্য বানানোর যে ক্ষমতা সেটা আসলেই সবাই পারেনা। শহুরে কিছু মানুষের মনে এই আইডিয়া ঠিকই বের হয়েছে। তারাই আবার ছাদেই বানিয়েছে কৃত্রিম পুকুর, খামার আরো কতো কি। যা আসলেই সেই মানুষটিকে আর বাকি আট-দশ থেকে এগিয়ে রাখবে। এভাবেই শহুরে মানুষগুলো প্রকৃতির সাথে তাদের সখ্যতা গড়ে তুলে।

অন্যদিকে গ্রামীণ জীবনে তো প্রকৃতির ছোয়া লেগেই আছে। এই জীবনে যারা বেড়ে ওঠে তাদেরকেই আমার আপন লাগে। নগরায়নের কোন ছোঁয়া নেই। প্রকৃতির সাথে মানুষের যে সখ্যতা তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। 
করোনাকালীন সময়ে মানুষ বুঝেছে প্রকৃতির সাথে কতোটা অবিচার করেছে মানবজাতি। প্রকৃতিকে বিলীন করে তারা যে আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখেছিল তা যে আসল স্বপ্ন নয় সেটাও তারা বুঝেছে। অর্থ- বিত্ত দিয়েও যে প্রকৃতির অভাব পূরণ করা যায়না মানবজাতির কাছে সেটা এখন স্বচ্ছ পানির মতো পরিষ্কার। রোবট বনে যাওয়া মানুষ গুলো হাতে দিনের পুরোটাভাগ  সময় পেয়েও কেমন যেন পরিশ্রান্ত। এই সময়েও যে তাদের মনে বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়েছে। ছোট একটা ভাইরাস কেন শুধু মানুষকেই কষ্ট দিচ্ছে , কেন অন্যকোন প্রাণীকূল কষ্ট পাচ্ছেনা সেটা নিয়েও তাদের বিস্তর সমালোচনা। প্রকৃতির সাথে যে পরিমাণ অবিচার করা হয়েছে সৃষ্টিকর্তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে মানবজাতিকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

(আরও পড়ুনঃ বৈশ্বিক সংকট ও সমাধান ভাবনা)


এখনই সময় মানবজাতি আর প্রকৃতির প্রেমে জোড়া লাগানোর। এ সম্পর্ক গড়ে উঠলে প্রকৃতি আবার  নবরূপে সেজে উঠতে পারবে। আর মানবজাতি পাবে তার পূর্বের মতো স্বাভাবিক জীবন।

লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুনঃ

মেসেঞ্জার অব কসমোলজি পেইজ

মেইল - shimul2016.bsm@gmail.com

Tuesday, August 11, 2020

আমাদের স্যার এখন টিচার হয়ে গেছে - মনীষা মোহাম্মদ।

   

মেসেঞ্জার অব কসমোলজি

আমাদের স্যার এখন টিচার হয়ে গেছে

তখন প্রাইমারী। হেডস্যার কাকার সাথে দেখা করতে এসেছেন। খুব সম্ভবত স্কুলের কোন মিটিং প্রসঙ্গে। আরও দুজন মুরুব্বি পাশেই বসা। আলোচনা চলছে। স্যার এসেছে শুনে আমি দেখা করতে গেলাম। যদিও তখন স্যারদের সামনে পড়া মানে নিজে একটা ভেড়া হয়ে যাওয়া। রাস্তায় স্যারকে দেখে সাইকেল থেকে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে সাইকেল পাগাড়ে গেলে হাতে পায়ে ব্যাথা, সাথে স্যারের "ওই গাধা তোরে নামতে কইছে ক্যাডা?" বলে বকাঝকা। আর সাইকেল থেকে না নেমে সালাম দিলেও " কিরে বেক্কল, সাইকেলে থেকেই সালাম দেয়?" বলে বকাঝকা খেতেই হতো। গাধা কিংবা বেক্কল সেজে মাথা নিচু রাখা ছাড়া উপায় থাকতো না। তখনকার স্যারেরা এখনকার মতোন টিচার ছিলেন না। কন্ঠ উঁচু করে বলা যেতো না, টিচার আবার বুঝান। না বুঝলে বোকা বোকা চেহারা নিয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। স্যার কাছে এসে বলতেন, কীরে বোকার দল, এখনো বুঝস নাই? সেই সব দিন গুলো অন্য রকম ছিলো। স্যারদের কথা গুলো ছিলো পবিত্র বাক্যের মতোন। এখনকার টিচারদের মতোন, স্যারদের গাঁয়ে প্রচলিত বড় ভাই, বড় ভাই গন্ধ ছিলোনা। বেশি কিছু ছিলো। অক্ষর না চেনা মা স্যারদের সম্পর্কে বলতেন- বাপ মা বানায় ভূত, স্যারে বানায় পুত। একথা শুনেছি স্কুলে যাবার আগেই। কথাটির মর্ম তখনো বুঝি না। কিন্তু কথাটা মন্ত্র বাক্য হয়ে মাথায় সেঁটে থাকতো। এখন যে কী দিন আইলো!

যা বলছিলাম। স্যার কাকার সাথে কথা বলছিলেন। আমি কাকার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, সালাম দেবোকি দেবোনা। আলাপ কালে পাশ থেকে কথা বলা ঠিক নয়। পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আলাপের মধ্য বিরতিতে কথা শুরু করতে হয়। বাবা শিখিয়েছেন। কিন্তু স্যারকে দেখে প্রথমেই সালাম দিতে হবে এটাও বলেছিলেন। পরে বুঝেছি সেদিন যে অবস্থায় ছিলাম তার নাম উভয় সংকট। যা হোক, আমি ছোট করে সালাম দিয়ে দিলাম। কন্ঠ স্বর হয়তো কাকার কান পর্যন্তই পোঁছেছিলো। দাঁড়িয়ে আছি। একটু পর কথা থামিয়ে স্যার বললেন, এই শিখাইছি? সালাম দেওয়াও ভুলে গেছস? উত্তর করার শক্তি সে সময়ের কোন ছাত্ররই নেই। বোকা হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। টেকনিকটা কাজে লেগেছিলো সেদিন। কাকা পক্ষ নিয়ে বললেন- স্যার, ছোটতো, ঠিক বুঝতে পারেনি। তবে আস্তে করে সালাম দিয়েছে। কাকার কল্যাণে শেষ রক্ষা হলো সেদিন।

হেডস্যার মাঝে মাঝেই একটি গান বলতেন, এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে, এই দিনেরে নিয়ে যাবো সে দিনেরও কাছে। পুরোটা মনে পড়ছেনা। খুব ভালো লাগতো স্যারের কন্ঠে। নিহিত অর্থ তখোন জানতামনা। এখনো ঠিক জানিনা। তবে বুঝি দিনকে এগিয়ে নিতে হয়। নইলে দিন ব্যাকডেটেড হয়ে যায়। ডেটএক্সপায়ার্ড।

দীর্ঘদিন হলো স্যারের সাথে দেখা নাই। দেখা হলে এবার গাধা কিংবা বোকা নয়, অপরাধী হয়ে মাথা নিচু করে রাখতে হবে। দিনকে আমরা এগিয়ে নিতে পারিনি। বরং স্যারদের যে দিন ছিলো তাকে এলোমেলো করে দিয়েছি। নষ্ট করে দিয়েছি ছাত্র শিক্ষকের পবিত্র সম্পর্ক। মোনাফেকের মতোন মুখে মুখে দিন এগিয়ে নেবার শিক্ষা গ্রহণ করেছি। দিনকে এগিয়ে না নিয়ে গিয়ে আমরা বরং স্থবির করে দিয়েছি। স্যারের পবিত্র শিক্ষাকে কলঙ্কিত করেছি।

দিন কেমন করে বদলে গেলো। চোখের সামনেই সব নষ্ট হয়ে গেলো। পুরাদমে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হলো। নৈতিকতাকে ডাস্টার দিয়ে মুছে দেওয়া হলো। বয়সের ভারে স্যার এখন হয়তো দেশ দুনিয়ার সব খবর জানেন না। স্যার হয়তো জানেন না তাঁর ছাত্ররা পেয়েছে পশুর আকৃতি। মানুষ হয়ে ওঠেনি। জানলে স্যার কী বসে বসে কাঁদবেন? স্যার কী ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন? আমি যদি বলি, স্যার, আপনারা এখন তথাকথিত বড় ভাই হয়ে গেছেন; স্যার কী আমার কানমলা দিবেন নাকি কোন জন্তু ভেবে চুপচাপ তাকিয়ে থাকবেন?

তখন আমি প্রাইমারী, আজ পিতা। তখন আমার মা অক্ষর চিনতো না, এখন বাবুর মা এম এ। তখন বাবা মেট্রিক, আজ আমি এম এস সি। দিন কত ভাবে বদলে গেছে! শুধু এগিয়ে যায়নি। এখনকার মায়েরা স্কুলে যাবার আগে কোন মন্ত্র বাক্য শেখান? এখনকার টিচারেরা কোন বাক্যকে জীবনের মন্ত্র ভাবেন?

সেই দিন গত হয়েছে। আজ সব কিছুই বাণিজ্যিক জলে ভেসে গেছে। পিতা মাতা, শিক্ষক শিক্ষিকা, মুরুব্বিগন সবাই বাণিজ্যিক জলে হাল ধরেছেন। সেদিনের সেই স্যারদের মুখোমুখি হলে আজ বোবা হয়ে ছাড়া ভিন্ন কোন উপায় নেই। তাঁরা জীবনাচার দিয়েই আমাদের মানুষ করতে চেয়েছিলেন। আমরা হয়ে গেছি পশু। আমাদের অনুজরা দ্রুত বর্ধনশীল পশু। পতন ফেরাবার  কেউ কী নেই?

মহান স্রষ্টা এপাড়ে ওপাড়ে স্যারদের দিন সুমহান মর্যাদা।


১২.০৮.২০২০



লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুনঃ

মেসেঞ্জার অব কসমোলজি পেইজ এ