| কবি তন্ময় সাহা |
Tuesday, December 21, 2021
কবি তন্ময় সাহা'র আলোচনা- ২
Saturday, December 11, 2021
দায়হীন সর্দারপনা স্বৈরাচারী - ভূবন মুন্সী।
থাকো দেশে অথচ গীত গাও নাঙের - ভূবন মুন্সী।
| messenger of cosmology |
Saturday, November 20, 2021
ধন্যবাদ, নতুন দলকে সুযোগ দেবার জন্য - মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল সুমন।
"ধন্যবাদ, নতুন দলকে সুযোগ দেবার জন্য"
| Messenger Of Cosmology |
Wednesday, October 27, 2021
প্রয়োজন শক্তিশালী স্থানীয় সরকার - মুরশীদ সেলিন।
| মেসেঞ্জার অব কসমোলজি |
Thursday, September 17, 2020
এবং সত্য কথা - এম ইকবাল।
সত্য কথার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে- তুমি কাউকে সবসময় খুশি রাখতে পারবে না যদি সে সত্যের অনুসন্ধানী না হয়।
Tuesday, August 18, 2020
মনরে কৃষি কাজ জানো না - মোঃ শামীম রেজা।
মনরে কৃষি কাজ জানো না
প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের শিক্ষা পদ্ধতি ছিল গুরুগৃহ কেন্দ্রীক। শিক্ষার্থীরা গুরুর আশ্রমে দীর্ঘদিন থাকতো এবং গুরু শিক্ষার্থীদের জীবন-যাপন থেকে শুরু করে প্রচলিত বিশেষায়িত বিষয় সমুহের উপর অধ্যায়ন করাতেন আগ্রহ এবং মেধা অনুসারে। ঔ সময়ের শিক্ষার ভিতর কৃষিকাজ হাতে কলমে শিক্ষা করা ছিল সব শিক্ষার্থীর জন্য অক্ষরজ্ঞান অর্জন করার মতই মৌলিক এবং বাধ্যতামূলক বিষয়। অক্ষর জ্ঞান প্রদানের সাথে সাথে তাদের প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা টুকরো জমি প্রদান করা হত এবং সেই জমিতে গুরুর নির্দেশ মত আবাদ করে ফসল ফলাতে হত।
এই শিক্ষা পদ্ধতির দরুন শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রথম পর্যায়েই নিজ দেশের মাটি-জল-আবহাওয়া সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হত এবং অধীত বিষয়ের সাথে খুব সহজে তার দেশের মাটির সংযোগ স্থাপন এবং প্রয়োগ করতে পারতো। ভারতবর্ষে অপ্রায়োগিক/অপ্রয়োজনীয় জ্ঞানের চর্চা কখনো ছিল না। এর ফলে পান্ডিত্যের অসার -অহমিকা তৈরি হওয়ারও কোন সুযোগ থাকতো না বরং অর্জিত জ্ঞান কত বেশি মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায় সেটাই ছিল শিক্ষা অর্জনের মৌলিক উদ্দেশ্যগত দিক। খুব অবাক করা বিষয় হলো এদেশের অক্ষরজ্ঞানহীন জনসমাজের ভিতর এখনও বিলুপ্ত প্রায় এরকম বিশ্বাস টিকে আছে যে এদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ তাদের অন্ধকার ভাগ্যাকাশে কোন একদিন সূর্যের মত জ্বলে উঠবে। রাতের অন্ধকারে নিজের শেষ সম্বলটুকু ও বিলিয়ে দিয়ে কেউ কেউ দুঃসাহসে বলে ওঠে "আমরা ওদের প্রদ্বীপের তেল জোগাবো ওরা আমাদের আলো জোগাবে"।
শিক্ষা পদ্ধতির ধারাবাহিক ক্রম-বিবর্তন, সমাজ, রাষ্ট্র,বিজ্ঞান ইত্যাদি পরিবর্তন মারফত কালের ফেরে বর্তমানে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে করে বাংলাদেশের মত দীর্ঘ উপনিবেশ শাসিত দেশের ছেলেমেয়েরা সেই অর্থে নিজের আগ্রহই আবিষ্কার করতে পারে না, করতে পারলেও সে বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করার পথ বিভিন্ন কারণে সুগম্য হয় না, পড়ালেখা করতে পারলেও অধীত বিষয়ের জ্ঞান প্রয়োগে এ দেশের মাটি খুজে পায়না।
প্রসঙ্গান্তরে একটু ভিন্নবিষয়ের অবতারনা করতে হচ্ছে...
বাংলাদেশে ষাটের দশকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসাদের প্রায় সবাই ছিল তৎকালিন ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত জমিদার পরিবার থেকে উঠে আসা। ফলে বিপ্লব প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনীয়তা তাদের বোধে যতটুকু না ছিল বাস্তবিক তার চাইতে অনেক বেশি ছিল সোভিয়েত-চীন-ভিয়েতনাম-কিউবা র তাত্ত্বিক প্রতিফলন।
সামন্ত পরিবারের এই বিপ্লবীরা পারিবারিক ভাবে স্বচ্ছল থাকার কারণে শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে একই সাথে পুজিঁর চরিত্র্য এবং মালিকানার পরিবর্তন আসছে সেটাও বুঝতে পেরেছিলেন। ক্ষমতা এবং ঐতিহ্যের পাড়ায় তারা সর্বহারার স্লোগানের ভিতর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন। খুব সংকীর্নদৃষ্টিতে এমনটাই দেখা যায় অন্তত বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করতে গেলে। তবে সেটা ছিল এক ঐতিহাসিক পরিস্থিতি যা ঘটা ছিল অনিবার্য।
(আরও পড়ুন - শ্রী রীতির কবিতা গুচ্ছ)
এসব কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের কথায় বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ স্বাধীনতার পরও ঘর থেকে বের হয়ে গেছে সর্বহারাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তারা মার্ক্স, লেলিন, মাও সে তুং এর নাম মুখস্থ করতে শিখেছিল। তারা আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের গল্প রূপকথার মত বিভোর হয়ে শুনতে শিখেছিল সে সময়।
৯০ এর দশকে এসে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ধরনটা পাল্টে যেতে থাকে। সচেতনভাবে দেশে বিরাজনৈতিক চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করার আয়োজন চলে বিভিন্ন মাধ্যমে। যার ফলাফল একবিংশ শতকে এসে বাংলাদেশে তরুণদের ভিতর রাজনৈতিক এনার্কির বর্ধিত সংক্রমন।
কমিউনিস্ট নেতাদের বিপ্লবী আদর্শ এদেশের মাটি-জল-আবহাওয়া পেল না ফলে আদর্শিক শক্তির বিকৃত প্রকাশ ঘটার ইতিহাস আমাদের সবার জানা। পার্টি গুলোর ভিতর বিভাজন, শ্রেণী শত্রু খতমের নামে খুন-খারাপি বাড়তে থাকায় একসময় এদেশের মানুষের কাছে তারা গনবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিচিতি পেল।
শিক্ষার সীমাবদ্ধতা হলো তা জ্ঞাত অর্থে সার্বজনীন হলেও প্রয়োগ অর্থে দেশ-কাল-পাত্র শর্ত মুক্ত হতে পারে না। এই শর্তগত কারণেই শিক্ষা পদ্ধতির কাঠামো এবং বিষয় দেশ বা কালাত্তীর্ণ নয় বরং পুরোটা দেশজ ও কালিক হতে প্রয়োগগত কারণেই বাধ্য।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট বিপ্লবী বা উদার গণতান্ত্রিক ধোঁয়া তোলা শিক্ষিত সমাজের নেতারা এদেশের জনগনের উন্নয়নের জায়গাটা আদতে কোথায় তার শিকড়টাই অনুসন্ধান করার তাগিদ অনুভব করেনি বা করতে চাননি। (চাইলে নদী গুলোর এই অবস্থা হত না, বন জঙ্গল ধ্বংস করে প্রকৃতি পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাতো না, এ দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা বিদেশী কোম্পানি গুলোর নিকট জীম্মি হয়ে যেত না।)
এদেশের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় চলমান বিচার ব্যবস্থা, উৎপাদন-বন্টন তথা সাংস্কৃতিক বোধ সমাজকে পরিচালনা করার জন্য এবং সমাজ প্রগতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পরিবর্তিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার সাথে তা সমাজ দর্শন এবং রাজনৈতিক দর্শনের নিরিখে বিচার-প্রয়োগ করার কোন দায়ই কেউ নেয়নি।
যারা এসব একটু আধটু বোঝার চেষ্টা করে এরা রাজনীতি বিমূখ দায়হীন শুকনো জ্ঞানের হম্বি-তম্বি করে বেড়ানো বুদ্ধিজীবি গোছের আর যারা এসব বোঝেনা কিন্তু এটা বোঝে যে সমাজে ক্ষমতার উপযোগিতা কতটুকু আর সেই ক্ষমতার কেন্দ্র রাজনীতি দ্বারা আচ্ছাদিত। সুতরাং তাদের যেতে হয় ক্ষমতার চর্চা করতে রাজনীতিতে। পুজিঁর সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক যত সমান্তরাল হতে থাকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সাথে সাথে পুজিঁও কেন্দ্রীভূত হতে থাকে।
এদেশের জনগন কোন রাজনৈতিক নেতাকে বিশ্বাস করতে চাই না এমনকি শিক্ষিত শ্রেণী কেও তারা বিশ্বাস এবং সম্মান কোনটাই করে না। শহুরে বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষগুলো যে ধড়িবাজ তা তারা এখন বুঝে ফেলেছে। এই অবিশ্বাস আর হরিলুটের যুগে দু-একজন যে কর্ম-যোগী, জ্ঞান-যোগী নেই তা সর্বতোভাবে বলা যায় না।
এদেশের জন্য সত্যি সত্যি কিছু করতে হলে এদেশের নদী, মাটি, ফসল, বীজ, বন, পাহাড় বুঝতে হবে আগে। এসব বুঝতে হলে এসবের সাথে যাদের নাড়ীর সম্পর্ক তাদের বুঝতে হবে। দুর থেকে বই পড়ে বোঝার ফলাফল পেয়ে আসছে এদেশ। মাঠে নামলে হয়তো চেয়ারে বসে চুরি করার ইচ্ছেটা আর নাও থাকতে পারে। চোর বা রাজনীতিবিদ বা বিপ্লবী প্রথমে ভিন্ন হয় চেতনাবোধে তারপরে ভিন্ন বা সমগোত্রীয় হয় চেতনা প্রয়োগে।
শুভ বোধের উন্মেষ ঘটুক এবং উন্মেষিত বোধ যথাযথ প্রয়োগের দিশা/কাঠামো পাক।
আরও পড়ুন: শামীম রেজার...
মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলের...
দেশীয় অর্থনীতি বনাম যোগান বিধি
লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুনঃ
মেসেঞ্জার অব কসমোলজি পেইজ
মোঃ শামীম রেজা
মোঃ মাসুদ মিয়া
শ্রী রীতি
ভূবন মুন্সী
মেইল করুনঃ
shimul2016.bsm@gmail.com
Monday, August 17, 2020
বৈরিতা নয়, চাই প্রকৃতি ও মানুষের সখ্যতা - একেএম খাদেমুল বাসার।
বৈরিতা নয়, চাই প্রকৃতি ও মানুষের সখ্যতা
যে শহর সোডিয়াম নিয়নের আলোয় আলোকিত হয় সে শহর কি করে তার মুগ্ধতা ছড়াতে পারবে? ইট-পাথরের শহর কখনোই প্রকৃতি দিয়ে তার মুগ্ধতা ছড়াতে পারেনি, আগামীতেও পারবে কি না সন্দেহ রয়েছে। কৃত্রিমতা দিয়ে আর কতটুকুই বা করা যেতে পারে। সেজন্য আমি সব সময় গ্রাম্য এলাকা বা প্রকৃতি পছন্দ করি। সুনসান নীরবতা আর পাখির কোলাহলে মুখর এক অপার্থিব সুখ। দিনের আলো কমে যাবার সাথে সাথে আরেক সৌন্দর্য এসে হাজির। যেখানে জোৎস্নার সাথে আবার জোনাকির মিতালী। আর যদি প্রকৃতির মাঝ দিয়ে নদী বয়ে যায় তাহলে তো পুরাই সোনায় সোহাগা একটা ব্যাপার। নদীতে ঢেউয়ের শব্দ বাড়তিমাত্রা যোগ করে।
(রুটার ব্রিগম্যানের এটা পরিবর্তনের সময়)
শহুরে জীবন আর গ্রামীণ জীবনের যে বিস্তর ফারাক তা কিন্তু চাইলে পুরোপুরি না হোক অনেকাংশে পরিবর্তন করা যেতে পারে। এতো এতো বিশাল অট্টালিকার ভিড়ে একটু ফাঁকা জায়গা পেলেই মানুষের মন আনন্দে নেচে উঠে আরেকটা অট্টালিকা তৈরির চিন্তায়। এই চিন্তাটা যদি একটু পরিবর্তন করা যেত তাহলে এই শহুরে জীবনে প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যেত। এ শহর যেমন মানুষদের রোবট বানিয়ে রেখেছে ঠিক সমানতালে অর্থ-বিত্তের এই ভয়ডরহীন খেলায়ও মাতিয়ে রেখেছে। যে খেলায় একেকটা মানুষ নিজেই তার প্রতিযোগী। এসব ভয়ডরহীন খেলায় বলির শিকার হচ্ছে প্রকৃতিই। যে প্রকৃতি আমাদের জলবায়ু থেকে শুরু করে নানানকাজে অবিরত সহায়তা করেই যায় তাকেই আমরা দূরে সরিয়ে দিচ্ছি অর্থ-বিত্তের নেশায় বুঁদ হয়ে।
আমরা চাইলে পারি মানুষের সাথে প্রকৃতির আগের সে শখ্যতা ফিরিয়ে আনতে। ইট-পাথরের এ শহরে দরকার শুধু একটু চিন্তাধারার পরিবর্তন। প্রতিটা মানুষ যদি তার নিজের মতো করে প্রকৃতিকে ভালবেসে তাদের নীড়ে ঠাঁই করে দেয় তাহলে অনায়াসেই সম্ভব এই অসাধ্যকে সাধন করা। মানুষ নাকি তার স্বপ্নের সমান বড়। যে শহরে বিভিন্ন দূষণে শ্বাস নিতেই এখন কষ্টকর হয়ে গেছে সে শহরে মানুষ কতবড় স্বপ্ন দেখে তা আসলে আমার বোধোগম্য নেই। আমার কাছে এ শহরের মানুষের স্বপ্নগুলোকে আঁষাঢে বৃষ্টির মতো মনে হয়। একজনের থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেলেই যেন এরা খুশি। প্রকৃতির সাথে যদি সখ্যতাই গড়ে না উঠে তাহলে এসব করে কি লাভ?
শহুরের কোটি কোটি মানুষের মধ্যেও কিছু ভিন্ন ধাঁচের মানুষ রয়েছে যাদের মাধ্যমেই এই শহর প্রকৃতির ছোঁয়া পায়। তারাই হাটিঁ হাঁটি পা পা করে প্রকৃতিকে তাদের নিজের মতো করে গড়ে তুলছে। মনে হয় একজন মা যেন তার সন্তানকে যেন কোলে পিঠে মানুষ করছে। তাদের দেখেই আরো কিছু মানুষ যোগ হচ্ছে। শহুরে জীবনে তারা তাদের ঘরকে প্রকৃতির মাধ্যমে যেভাবে সাজিয়েছে তা আসলেই দেখার মতো।
আরও পড়ুনঃ পৃথিবী কোন পথে?
একটা বিল্ডিংয়ের ছাদকে অযাচিতভাবে ফেলে না রেখে সেখানে আপন মমতায় বৃক্ষরোপন করে পাখিদের অভয়ারণ্য বানানোর যে ক্ষমতা সেটা আসলেই সবাই পারেনা। শহুরে কিছু মানুষের মনে এই আইডিয়া ঠিকই বের হয়েছে। তারাই আবার ছাদেই বানিয়েছে কৃত্রিম পুকুর, খামার আরো কতো কি। যা আসলেই সেই মানুষটিকে আর বাকি আট-দশ থেকে এগিয়ে রাখবে। এভাবেই শহুরে মানুষগুলো প্রকৃতির সাথে তাদের সখ্যতা গড়ে তুলে।
অন্যদিকে গ্রামীণ জীবনে তো প্রকৃতির ছোয়া লেগেই আছে। এই জীবনে যারা বেড়ে ওঠে তাদেরকেই আমার আপন লাগে। নগরায়নের কোন ছোঁয়া নেই। প্রকৃতির সাথে মানুষের যে সখ্যতা তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
করোনাকালীন সময়ে মানুষ বুঝেছে প্রকৃতির সাথে কতোটা অবিচার করেছে মানবজাতি। প্রকৃতিকে বিলীন করে তারা যে আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখেছিল তা যে আসল স্বপ্ন নয় সেটাও তারা বুঝেছে। অর্থ- বিত্ত দিয়েও যে প্রকৃতির অভাব পূরণ করা যায়না মানবজাতির কাছে সেটা এখন স্বচ্ছ পানির মতো পরিষ্কার। রোবট বনে যাওয়া মানুষ গুলো হাতে দিনের পুরোটাভাগ সময় পেয়েও কেমন যেন পরিশ্রান্ত। এই সময়েও যে তাদের মনে বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়েছে। ছোট একটা ভাইরাস কেন শুধু মানুষকেই কষ্ট দিচ্ছে , কেন অন্যকোন প্রাণীকূল কষ্ট পাচ্ছেনা সেটা নিয়েও তাদের বিস্তর সমালোচনা। প্রকৃতির সাথে যে পরিমাণ অবিচার করা হয়েছে সৃষ্টিকর্তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে মানবজাতিকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
(আরও পড়ুনঃ বৈশ্বিক সংকট ও সমাধান ভাবনা)
এখনই সময় মানবজাতি আর প্রকৃতির প্রেমে জোড়া লাগানোর। এ সম্পর্ক গড়ে উঠলে প্রকৃতি আবার নবরূপে সেজে উঠতে পারবে। আর মানবজাতি পাবে তার পূর্বের মতো স্বাভাবিক জীবন।
লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুনঃ
মেসেঞ্জার অব কসমোলজি পেইজ
মেইল - shimul2016.bsm@gmail.com
Tuesday, August 11, 2020
আমাদের স্যার এখন টিচার হয়ে গেছে - মনীষা মোহাম্মদ।
আমাদের স্যার এখন টিচার হয়ে গেছে
তখন প্রাইমারী। হেডস্যার কাকার সাথে দেখা করতে এসেছেন। খুব সম্ভবত স্কুলের কোন মিটিং প্রসঙ্গে। আরও দুজন মুরুব্বি পাশেই বসা। আলোচনা চলছে। স্যার এসেছে শুনে আমি দেখা করতে গেলাম। যদিও তখন স্যারদের সামনে পড়া মানে নিজে একটা ভেড়া হয়ে যাওয়া। রাস্তায় স্যারকে দেখে সাইকেল থেকে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে সাইকেল পাগাড়ে গেলে হাতে পায়ে ব্যাথা, সাথে স্যারের "ওই গাধা তোরে নামতে কইছে ক্যাডা?" বলে বকাঝকা। আর সাইকেল থেকে না নেমে সালাম দিলেও " কিরে বেক্কল, সাইকেলে থেকেই সালাম দেয়?" বলে বকাঝকা খেতেই হতো। গাধা কিংবা বেক্কল সেজে মাথা নিচু রাখা ছাড়া উপায় থাকতো না। তখনকার স্যারেরা এখনকার মতোন টিচার ছিলেন না। কন্ঠ উঁচু করে বলা যেতো না, টিচার আবার বুঝান। না বুঝলে বোকা বোকা চেহারা নিয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। স্যার কাছে এসে বলতেন, কীরে বোকার দল, এখনো বুঝস নাই? সেই সব দিন গুলো অন্য রকম ছিলো। স্যারদের কথা গুলো ছিলো পবিত্র বাক্যের মতোন। এখনকার টিচারদের মতোন, স্যারদের গাঁয়ে প্রচলিত বড় ভাই, বড় ভাই গন্ধ ছিলোনা। বেশি কিছু ছিলো। অক্ষর না চেনা মা স্যারদের সম্পর্কে বলতেন- বাপ মা বানায় ভূত, স্যারে বানায় পুত। একথা শুনেছি স্কুলে যাবার আগেই। কথাটির মর্ম তখনো বুঝি না। কিন্তু কথাটা মন্ত্র বাক্য হয়ে মাথায় সেঁটে থাকতো। এখন যে কী দিন আইলো!
যা বলছিলাম। স্যার কাকার সাথে কথা বলছিলেন। আমি কাকার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, সালাম দেবোকি দেবোনা। আলাপ কালে পাশ থেকে কথা বলা ঠিক নয়। পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আলাপের মধ্য বিরতিতে কথা শুরু করতে হয়। বাবা শিখিয়েছেন। কিন্তু স্যারকে দেখে প্রথমেই সালাম দিতে হবে এটাও বলেছিলেন। পরে বুঝেছি সেদিন যে অবস্থায় ছিলাম তার নাম উভয় সংকট। যা হোক, আমি ছোট করে সালাম দিয়ে দিলাম। কন্ঠ স্বর হয়তো কাকার কান পর্যন্তই পোঁছেছিলো। দাঁড়িয়ে আছি। একটু পর কথা থামিয়ে স্যার বললেন, এই শিখাইছি? সালাম দেওয়াও ভুলে গেছস? উত্তর করার শক্তি সে সময়ের কোন ছাত্ররই নেই। বোকা হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। টেকনিকটা কাজে লেগেছিলো সেদিন। কাকা পক্ষ নিয়ে বললেন- স্যার, ছোটতো, ঠিক বুঝতে পারেনি। তবে আস্তে করে সালাম দিয়েছে। কাকার কল্যাণে শেষ রক্ষা হলো সেদিন।
হেডস্যার মাঝে মাঝেই একটি গান বলতেন, এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে, এই দিনেরে নিয়ে যাবো সে দিনেরও কাছে। পুরোটা মনে পড়ছেনা। খুব ভালো লাগতো স্যারের কন্ঠে। নিহিত অর্থ তখোন জানতামনা। এখনো ঠিক জানিনা। তবে বুঝি দিনকে এগিয়ে নিতে হয়। নইলে দিন ব্যাকডেটেড হয়ে যায়। ডেটএক্সপায়ার্ড।
দীর্ঘদিন হলো স্যারের সাথে দেখা নাই। দেখা হলে এবার গাধা কিংবা বোকা নয়, অপরাধী হয়ে মাথা নিচু করে রাখতে হবে। দিনকে আমরা এগিয়ে নিতে পারিনি। বরং স্যারদের যে দিন ছিলো তাকে এলোমেলো করে দিয়েছি। নষ্ট করে দিয়েছি ছাত্র শিক্ষকের পবিত্র সম্পর্ক। মোনাফেকের মতোন মুখে মুখে দিন এগিয়ে নেবার শিক্ষা গ্রহণ করেছি। দিনকে এগিয়ে না নিয়ে গিয়ে আমরা বরং স্থবির করে দিয়েছি। স্যারের পবিত্র শিক্ষাকে কলঙ্কিত করেছি।
দিন কেমন করে বদলে গেলো। চোখের সামনেই সব নষ্ট হয়ে গেলো। পুরাদমে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হলো। নৈতিকতাকে ডাস্টার দিয়ে মুছে দেওয়া হলো। বয়সের ভারে স্যার এখন হয়তো দেশ দুনিয়ার সব খবর জানেন না। স্যার হয়তো জানেন না তাঁর ছাত্ররা পেয়েছে পশুর আকৃতি। মানুষ হয়ে ওঠেনি। জানলে স্যার কী বসে বসে কাঁদবেন? স্যার কী ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন? আমি যদি বলি, স্যার, আপনারা এখন তথাকথিত বড় ভাই হয়ে গেছেন; স্যার কী আমার কানমলা দিবেন নাকি কোন জন্তু ভেবে চুপচাপ তাকিয়ে থাকবেন?
তখন আমি প্রাইমারী, আজ পিতা। তখন আমার মা অক্ষর চিনতো না, এখন বাবুর মা এম এ। তখন বাবা মেট্রিক, আজ আমি এম এস সি। দিন কত ভাবে বদলে গেছে! শুধু এগিয়ে যায়নি। এখনকার মায়েরা স্কুলে যাবার আগে কোন মন্ত্র বাক্য শেখান? এখনকার টিচারেরা কোন বাক্যকে জীবনের মন্ত্র ভাবেন?
সেই দিন গত হয়েছে। আজ সব কিছুই বাণিজ্যিক জলে ভেসে গেছে। পিতা মাতা, শিক্ষক শিক্ষিকা, মুরুব্বিগন সবাই বাণিজ্যিক জলে হাল ধরেছেন। সেদিনের সেই স্যারদের মুখোমুখি হলে আজ বোবা হয়ে ছাড়া ভিন্ন কোন উপায় নেই। তাঁরা জীবনাচার দিয়েই আমাদের মানুষ করতে চেয়েছিলেন। আমরা হয়ে গেছি পশু। আমাদের অনুজরা দ্রুত বর্ধনশীল পশু। পতন ফেরাবার কেউ কী নেই?
মহান স্রষ্টা এপাড়ে ওপাড়ে স্যারদের দিন সুমহান মর্যাদা।
১২.০৮.২০২০
লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুনঃ
মেসেঞ্জার অব কসমোলজি পেইজ এ
Friday, July 31, 2020
রেমিট্যান্সের দেশে বেওয়ারিশ প্রবাসীরা - মিরান।
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
জুলাই মাসে বাংলাদেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে, যার পরিমাণ 'দুই বিলিয়ন' ডলারের অধিক। নতুন (জুলাই মাসে) আসা রেমিট্যান্সের ফলে 'বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ'ও নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে, বর্তমানে বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ '৩৭ বিলিয়ন' ডলারেরও অধিক। এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ, অর্থনৈতিক-বিশ্লেষক, সচেতন নাগরিক সমাজ, সর্বোপরি সবাই আনন্দিত ও উৎফুল্ল। সরকারের কর্তা-ব্যক্তিরা রেমিট্যান্সের এ প্রবাহকে নিজেদের সফলতা বলেও দাবি করেছে। অথচ কভিড-১৯ মহামারির কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার এ দুঃসময়ে যারা (রেমিট্যান্স যোদ্ধরা) মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিজেদের সুখ-শান্তিকে বিসর্জন দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন, রাষ্ট্র তাঁদেরকে প্রবাসে ন্যুনতম নিরাপত্তা ও মানবিক সহযোগিতা দিতে অপারগ বা অনিচ্ছুক।
মালেশিয়ায় গ্রেফতারকৃত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক রায়হান কবিরের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের 'প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী' ইমরান আহমেদ যে মন্তব্য করেছেন, তা অযাচিত, অগ্রহনযোগ্য, অদূরদর্শি ও সংবিধান বিরোধী। একজন নাগরিকের বিদেশে আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে, রাষ্ট্র তাঁকে সার্বিক সহায়তা দিতে বাধ্য, তাঁকে তা দেয়া হয়নি। রায়হন কবীরের ভাষ্যমতে, "আমি তো সত্য কথা বলেছি, কভিড মৌসুমে আমরা যে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়েছি, তাই বলেছি। আমি তো কোনো অপরাধ করিনি।" অথচ তাঁর কথাগুলো বলা দরকার ছিল রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, কারণ, কভিড মৌসুমে মালেশিয়ায় ৮-৯ লক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের অনিশ্চিত ও দুর্দশাগস্ত জীবন কেটেছে, যাদের যাবতীয় নিরাপত্তার দায়ভার আইনানুযায়ী স্বীয়-রাষ্ট্রের উপরই বর্তায়।
মালেশিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় '৬ লক্ষ' বৈধ ও '২-৩ লক্ষ' অবৈধ অভিবাসী শ্রমিক রয়েছে। কভিড-১৯ মৌসুমে মালেশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে ন্যুনতম মানবিক সহায়তা দেয়া হয়নি। উক্ত মৌসুমে মালেশিয়া সরকার বিদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সাথে যে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে, তা বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হয়েছে। ঐ দেশে প্রবাসীদের অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'আল জাজিরায়' একটি প্রতিবেদন তৈরি করার সময় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক রায়হান কবিরের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। উক্ত সাক্ষাৎকারে রায়হান কবির মালেশিয়ায় (কভিড মৌসুমে) প্রবাসী শ্রমিকদের বাস্তবিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে, তাঁদেরকে যে ন্যুনতম মানবিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়নি তার বর্ণনা দিয়েছে। এ কারণে মালেশিয়া পুলিশ রায়হান কবীরকে রাষ্ট্র-বিরোধী ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার দায়ে গ্রেফতার করেছে।
রায়হান কবীরকে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে ও অবিলম্বে মুক্তির দাবীতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, আল জারিরা, প্রবাসী শ্রমিক সংগঠন ও দেশের নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ করলেও বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে নিশ্চুপ ছিল, বরং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিবিসি বাংলাকে বলেছে, "এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সে বাংলাদেশের নাগরিক। তার প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বেশি। সেখানে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করে। ফলে, একজন ব্যক্তির কী হলো তা আমাদের চিন্তার বিষয় নয়।"
কথা হলো, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি সত্যিই প্রবাসীদের সার্বিক স্বার্থের বিষয় নিয়ে আন্তরিক নাকি মালেশিয়া সরকারের সাথে এ ব্যাপারে দরকষাকষি করতে অপারগ? তারা যদি সত্যিই প্রবাসীদের কল্যান নিয়ে এত আন্তরিক হন, তাহলে কভিড মৌসুমে মালেশিয়ায় ৮-৯ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের অমানবিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেন? প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠালে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়, রেমিট্যান্সের উক্ত প্রবাহকে নিজেদের সফলতা বলে দাবি করে, অথচ প্রবাসে শ্রমিকদের অমানবিক পরিস্থিতিতে নিজ দেশ থেকে মানবিক নিরাপত্তা ও সহায়তা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনা। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রায়হান কবীর যে কনস্যুলেট সুবিধা পাওয়ার কথা, ন্যুনতম সে আইনি সহায়তাও রাষ্ট্র তাঁকে দেয়নি, কিংবা দিতে অপারগ।
এপ্রিল-মে মাসে লেবাননের মুদ্রা 'লিরা'র মান কমে যাওয়াতে বেতন বৈষম্যের স্বীকার হয়েছিল প্রবাসী শ্রমিকেরা, স্থানীয়দের বেতন স্কেল আগের মত থাকলেও প্রবাসী শ্রমিকদের বেতন কমানো হয় ৪০%-৫০%। ফলে, সে দেশে কর্মরত প্রায় '২ লক্ষ বাংলাদেশি'সহ প্রবাসী শ্রমিকদের আয়-রোজগার বৃহদাকারে কমে যাওয়াতে তাঁদের জীবনযাপন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো তো দূরে থাক, থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে না-পেরে প্রবাসী শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছিল। উক্ত বিক্ষোভে একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদ মাধ্যমগুলো (মিডলইষ্ট মনিটর, আনাদোলু এজেন্সি, আল জাজিরা ইত্যাদি) বিভিন্ন প্রতিবেদন করলেও বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলো নিরব ছিল। অথচ, এক্ষেত্রে বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলোর দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি ছিল, যেহেতু লেবাননে উক্ত বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিল বাংলাদেশি শ্রমিকেরাই। ঐ সময়ে প্রায় '২ লক্ষ' প্রবাসীদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়লেও বাংলাদেশ সরকার সে ব্যাপারে চিন্তা করার সময় পায়নি। বেশ কয়েকজন বাংলাদেশিদের আটক ও একজনকে হত্যা করা হলেও বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে কোনো সহযোগিতা তো পায়নি, বরং বিক্ষোভকারীদের দোষারোপ করা হয়েছিল। তারপরও 'রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি'কে নিজেদের সফলতা বলেই দাবি করে আমাদের কর্তা-ব্যক্তিরা।
কভিড-১৯ মহামারী সবচেয়ে ভয়ানক রুপ নিয়েছিল সিঙ্গাপুরের প্রবাসী শ্রমিকদের 'ডর্মিটরিগুলোতে'। ঐ দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকাংশই 'জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণ' খাতে কর্মরত। অতি-অল্প রুজিতে অতি-নিন্মমানের ডর্মিটরিতে থাকে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। কভিড সংক্রমণ রোধে সিঙ্গাপুরে লকডাউন চলাকালে বাংলাদেশি (অতি ঘনবসতিপূর্ণ) ডর্মিটরিগুলোতে কোনো মানবিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহন করেনি সে দেশের সরকার। ফলে, সিঙ্গাপুরে কভিড সংক্রমণের 'হট স্পট' হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশি শ্রমিকদের ডর্মিটরিগুলো। ঐ সময়ে সিঙ্গাপুরে মোট কভিড আক্রান্তের প্রায় ৫০% ছিল বাংলাদেশি শ্রমিক। স্বাস্থ্য-বীমা না-থাকাতে সে দেশের সরকার আক্রান্ত শ্রমিকদেরকে কোনোরকম চিকিৎসা সুবিধা দেয়নি। মৃত্যুও হয়েছে সমান তালে। আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ক কোনো ধারাই মানেনি সিঙ্গাপুর। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে সিঙ্গাপুর সরকারকে আন্তর্জাতিক আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য চাপ প্রয়োগ করা তো দূরে থাক, বরং ব্যস্ত ছিল কীভাবে উক্ত বিষয়টি (শ্রমিকদের নিরাপত্তা) এড়িয়ে চলা যায় তা নিয়ে।
মাতৃভূমি মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। জীবনের নিরাপত্তার জন্য কভিডের হটস্পট ইটালিসহ ইউরোপের দেশগুলো থেকে যখন প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসছিল, তাঁদেরকে সরকারিভাবে কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যানসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় সমালোচনার স্বীকার হয়েছিল। তখন প্রবাসীদেরকে 'লাটসাহেব' বলে ব্যঙ্গ করেছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। বস্তুত, তারা কি মনের খায়েশ মেটাতে দেশে ফিরে এসেছিল? না। কারণ, ইটালি ঐ সময়ে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল, যে পরিস্থিতিতে ইটালি সরকারের পক্ষে নিজেদের নাগরিকদেরকে চিকিৎসা সেবা না-দিয়ে প্রবাসীদেরকে চিকিৎসা দেয়াটা অসম্ভব ছিল। তাছাড়া 'এক্সচুয়াল লকডাউন' কার্যকর হওয়ার কারণে মারাত্মক খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল দেশটিতে। মিলান, ভেরোনাসহ উত্তর ইটালির বেশ কয়েকটি বড় শহরে খাবারের দোকান ও সুপারশপ লুটপাট হয়েছিল। সেদেশের নেটিভরা যেখানে নানামুখী সংকটে জর্জরিত, বেতন বন্ধ থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা, যাদের অনেকেরই স্বাস্থ্য-বীমাও নাই, নিজ দেশে চলে আসাটাই কি স্বাভাবিক নয়? "I fuck this country-system" বাক্যটির মর্মার্থ আমরা তখন না-বুঝলেও এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতেছি।
লক্ষীপুর-২ আসনের সাংসদ পাপুল (এশিয়ার মানবপাচারকারী চক্রের প্রধান হোতা) কাণ্ডের পর কুয়েত সরকার সে দেশের ভিসা বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে, বাংলাদেশিদের জন্য কঠোর নীতিমালা যুক্ত করার ঘোষণাও দিয়েছে। বেশকিছু শ্রমিককে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি-জোটের দেশগুলোতেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি শ্রম রপ্তানি করে থাকে। সৌদি-জোটের (সৌদি, বাহরাইন, কুয়েত,মিশর,আরব আমিরাত) দেশগুলো পররাষ্ট্র নীতি, শ্রম নীতি, বাণিজ্য নীতি প্রণয়নে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে থাকে, অর্থাৎ একই নীতিমালা অনুসরণ করে। ফলে, কুয়েতের পাশাপাশি সৌদি-জোটের অন্যান্য দেশগুলোতেও বাংলাদের শ্রম বাজার হুমকির মুখে পড়ে গেছে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদ ও পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষকেরা। বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের মূল প্রবাহটা আসে এসব দেশ থেকেই।
প্রবাসে বাংলাদেশি
শ্রমিকদের জন্য একটি আতঙ্কের নাম হলো 'বাংলাদেশ দূতাবাস'। প্রবাসী
শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও বিদেশে বাংলাদেশি
দূতাবাসগুলোতে তাঁদের সাথে আচরণ করা হয় অমানবিক। তাঁদের কোনো অভিযোগ তেমন
আমলে নেয়া হয়না। আইনি সহায়তা পাওয়াও দুষ্কর। অবৈধভাবে মানব পাচার থেকে শুরু
করে, ঘুষ, নির্যাতন, কাগজপত্র আটকে রেখে টাকা আদায়সহ অভিযোগের শেষ নেই
দূতাবাসগুলোর বিরুদ্ধে। গতবছর ব্রুনাইয়ের বাংলাদেশ দূতাবাসে একজনকে বেধড়ক
মারধরের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল যা আমাদেরকে দূতাবাসগুলোতে প্রবাসীদের সাথে
কেমন আচরণ করা হয়, তার একটি ধারণা দিয়েছে।
সৌদি থেকে প্রতিবছর অসংখ্য
নারী-শ্রমিক ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়ে দেশে ফিরে আসে, শারীরিক
নির্যাতনের শিকার হয়। তাঁরা দূতবাসে অভিযোগ জানিয়ে কোনো ফল পায়না। দুই বছর
আগে একই কারণে (ধর্ষণ, নারী নির্যাতন) কুয়েতের সাথে ফিলিপাইন সরকারের চরম
উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে ফিলিপাইন প্রেসিডেন্ট 'রড্রিগো
দুতার্তে' কুয়েত সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছিল, "Is there any problem in your
culture? Is there any problem in your values?" আমাদের পক্ষ থেকে এরকম
কঠিন বাক্য প্রয়োগ করার সাহস কেউ রাখেনা, যা আমাদের জন্য একটি 'মাইনাস
পয়েন্ট' বটে।
প্রতিবছর ব্যাপক পরিমাণে (বিদেশে) অর্থপাচার হয়ে থাকে। এ অর্থপাচারের মূল হোতা হলো "অনৈতিক সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদ, ঋণ-খেলাপি ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আমলা ও বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারি।" এত অর্থপাচার হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ মাইলফলকে পৌঁছানোর পেছনে একটাই কারণ, তা হলো, ব্যাপক পরিমাণ 'প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স'। ক্বুরবানির কারণে হঠাৎ রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়লেও সামনের দিনগুলোতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশংকা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অনেক প্রবাসী শ্রমিক কভিড মৌসুমে দেশে এসে এখনও আটকে আছে। কঠোর ইমিগ্রেশন প্রসেসিংয়ের কারণে যেতে পারছেনা। তার উপর "মরার উপর খাঁড়ার ঘা" হয়ে দেখা দিচ্ছে "কভিডের ভুয়া নেগেটিভ সার্টিফিকেট জালিয়াতির কারণে বিদেশে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি সংকট"। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইটালি, দ. কোরিয়া, জাপানসহ কয়েকটি দেশে কভিডের ভুয়া নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে (পরবর্তীতে পজিটিভ সনাক্ত হয়) বাংলাদেশিদের ভ্রমণের কারণে সারাবিশ্বে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ নিয়ে আতংক সৃষ্টি হয়েছে। কভিডের আচমকা ধাক্কা খাওয়া উন্নত বিশ্বের দেশগুলো কখনোই চাইবেনা যে, অন্যান্য দেশ থেকে কভিড পজিটিভ নিয়ে কেউ ভ্রমণ করুক। কথায় আছে, "ন্যাড়া একবার বেল তলায় যায়"। ইতোপূর্বে ইটালির কয়েকটি শহরে বাংলাদেশি অভিবাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়েছে। অন্যদিকে, কভিড সার্টিফিকেট না-থাকার কারণে অনেক প্রবাসী শ্রমিক ফ্লাইট ক্যানসেল করতে বাধ্য হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রবাসী যারা দেশে আটকে আছে, চাকরিতে যোগ দিতে পারছেনা, তাঁদেরকে অতিদ্রুত কর্মস্থলে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
সীমিত
ভূখন্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস আমাদের এ সোনার বাংলাদেশে।
স্রষ্টা-প্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ শ্রমই আমাদের অন্যতম মূলধন। কোটি কোটি
মানুষের ঘামই এদেশের অর্থনীতির মূল জালানি। এ জালানি (ঘাম) রপ্তানি করেই
আমরা দু'বেলা দুমুঠো খেতে পাই।
কভিড-১৯ মহামারির কারণে এমনিতেই দেশে
বেকারত্ব সংকট ঘনীভূত হয়ে আসছে, যারা চাকরি হারিয়েছে কিংবা চাকরি হারানোর
ঝুঁকিতে রয়েছে তাঁদের সংখ্যা প্রায় 'দেড় কোটি'। তার উপর প্রবাসীদের যারা
দেশে আটকে আছে, তাঁরা যদি কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে না-পারে; মধ্যপ্রাচ্যসহ
বাংলাদেশের শ্রম বাজারগুলো থেকে শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসে; তাহলে,
আমাদের অর্থনীতির 'তাসের ঘর' ধ্বসে পড়বে নিঃসন্দেহে। তাই, সরকারের উচিত
প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি আরও আন্তরিক হওয়া এবং আমাদের শ্রম বাজারগুলোকে
টিকিয়ে রাখতে যথাযথ, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহন করা। সবসময়ের মত
এক্ষেত্রেও যেন "চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে" দশা না-হয়।
Wednesday, July 22, 2020
রাজনীতি নেই || ভূবন মুন্সী।
| ভূবন মুন্সী |
ওয়ার্কাস পার্টির রাশেদ খান মেনন বলেছেন- রাজনীতিটা রাজনীতিকদের হাতে নেই। (বাংলাদেশ প্রতিদিন - ৬/৭/২০১৯)।
রাজনীতি যদি রাজনীতিকদের হাতে না থাকে, রাজনীতি কি আর রাজনীতি থাকে? অবশ্যই না। হয়ে উঠে দুর্নীতি।
রাজনীতি তখন হয়ে উঠে ভয়ংকর তান্ডবের, খুন হত্যা গুম ধর্ষন শোষনে নারকী রূপ পায় অরাজনৈতিকদদের হাতে থাকা রাজনৈতিক মানচিত্র।
সাপ যদি সাপুরের হাত থেকে ফসকে যায় বা অবাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসে বাক্স থেকে বা তস্করের করতলগত হয়, তবে ঐ সাপ আনন্দের যোগান না দিয়ে হয়ে উঠে লুন্ঠের হাতিয়ার, তুমুল ধোকা দেবার, ভয় দেখাবার জ্যান্ত ভূত।
বর্ষীয়ান রাজনীতিক যাঁরা আছেন, যাঁরা যৌবনের শৈশবকাল হতে রাজপথে, রাজপথ হতে যাতায়াত সংসদে, যাঁরা রাজনীতিটাকে বশীভূত সাপের মতোই হাতে রেখেছিলেন মানুষের কল্যাণে- তাঁদের চোখের সামনে রাজনীতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে ভিন্ন হাতে- তবে তাঁরা কী অসহায়! মানুষকে ভালোবেসেই এতোদিন ধরে রাজনীতি করে আসছেন, সেই ভালোবাসার দায়বদ্ধতা থেকেই যথার্থ রাজনৈতিক অনুশীলনটা জরুরি ছিলো, আর যথার্থ রাজনৈতিক অনুশীলন থাকলে রাজনীতি অরাজনৈতিকদদের হাতে চলে যাবার কথা ছিলো না। তবে গলদটা কোথায়, কাদের ভিতর?
বেশ ক'দিন আগে ধানের দাম সংক্রান্ত সংকটে মন্ত্রী মহোদয় বললেন রাজনৈতিক কারনেই তা নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না, তবে রাজনীতি কৃষকের কল্যাণের জন্য নয় বা কল্যান করার অক্ষমতায় বর্তমান, তবে ঘরের চেয়ে কোন একটি ঘটি বড় হয়ে উঠেছে আজ, নাকি 'পথ জানা নাই' এর আবুলের শাসনকাল!
এবার আসি স্থানীয় নির্বাচনে প্রতীক প্রসঙ্গে-
স্থানীয় রাজনীতি যদি জাতীয় রাজনীতি হতে পৃথক সত্ত্বা হয়, তবে এটা নিয়ে জাতীয় নেতাদের মাথা ঘামানোর কারণ থাকতো না। আছে বলেই স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে লম্ফ জম্ফ হয়।
দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন অভিন্ন রাজনৈতিক চর্চাকে রুট থেকে সেন্টার পর্যন্ত করেছে, সাতচল্লিশ বছর ধরে বঞ্চিত থাকা রাজনৈতিক দলের মর্যাদা সমুন্নত করেছে, আর রাজনৈতিক দল মানেই অসংখ্য মানুষ।
কিন্তু অসুরের দেশে লক্ষীকে পায়ে ঠেলা হয়- তেমনই ঘটছে আজ। দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আ'লীগ আর এককালে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি উভয়ের কাছ থেকে প্রতীক দেওয়ার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক হয়ে উঠে এসেছে এবং ইদিনিং উভয়ের কাছ থেকে আসছে। স্থানিকে প্রতীক না রাখার মনোভাব নিয়ে উনারা কী বুঝাতে চাচ্ছেন যে, জাতীয় নেতারা দলীয় মার্কার ওয়ারিশ, আর যাঁরা দিন রাতত প্রত্যক্ষ জনসম্পৃক্ত থেকে, শ্রম ঘাম দিয়ে ইউনিয়ন ওয়ার্ডে দলীয় কার্যক্রম সচল রাখেন তাঁরা দলীয় মার্কায় বেওয়ারিশ? স্থানিক নেতারা আপন রাজনৈতিক মর্যাদায় সচেতন হয়ে প্রশ্ন তুললে কী জবাব দিবেন বর্ষীয়ানগন? যৌক্তিক কোন উত্তর আমার কাছে নেই।
মেনন সাহেবের কথায় ফিরে আসি, রাজনীতিটা আসলেই আজ রাজনীতিকদের হাতে নেই। দেশের দিকে তাকালে, পত্রিকায় চোখ রাখলে অন্তত তা স্পষ্ট। স্বাধীন দেশে আমরা রাজনৈতিক চর্চাহীনতায় যোগ্য নেতা কর্মীর জন্ম দিতে পারি নাই।
একাত্তর হতে খুঁড়িয়ে চলতে থাকা এদেশে দুটি বিষয় সত্য আজ- ২য় সত্য রাজনীতিটা রাজনীতিকদের হাতে নেই, ১ম সত্য রাজনীতিবিদ শূন্যতায় ভুগছে বাংলাদেশ।
০৬.০৭.১৯
Saturday, July 18, 2020
আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী : গারো, হাজং এবং কোচ || সোহানুর রহমান।
| সোহানুর রহমান, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী। |
বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। আমাদের প্রিয় এই দেশের প্রধান জনগোষ্ঠী বাঙালি হলেও এখানে বসবাস করে নানা জাতি, নানা ভাষা ও নানান সংস্কৃতির মানুষ। বাংলাদেশে রয়েছে অনেকগুলো আদিবাসী জনগোষ্ঠী। ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। আদিবাসীদের অনেকেই উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নামেও অভিহিত করে থাকেন। ২০১১ সালের আদমশুমারি ও গৃহগণনা প্রতিবেদনে আদিবাসীদের জন্য ‘এথনিক পপুলেশন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখা নিয়ে রয়েছে ভিন্নভিন্ন মত। উইকিপিডিয়াতে এই সংখ্যা ৪৫টি থাকলেও বিবিএস রিপোর্ট ১৯৮৪ ও ১৯৯১ সালে এই সংখ্যা যথাক্রমে ২৪ ও ২৯টি। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে এই সংখ্যা ২৭টি।
বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই সমতল অঞ্চলে বসবাস করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৪। পার্বত্য চট্টগ্রামের পর ময়মনসিংহে রয়েছে ৯টি। শেরপুর জেলাতে ৯টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। শেরপুরে যেসব আদিবাসী জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে- গারো, কোচ, হাজং, বানাই, রাজবংশী, বর্মন, ডালু, হদি এবং হরিজন। চলতি রচনাটি শেরপুরে বসবাসরত দুইটি প্রধান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয়াদি সংক্ষেপে তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র।
গারো
মঙ্গোলিয় মানবধারার অন্তর্গত গারো জনগোষ্ঠীর বসবাস প্রধানত ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও সিলেট অঞ্চলে। গারো জনগোষ্ঠী মাতৃপ্রধান। মেয়েরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারীনি। বিয়ের পর বর স্ত্রীর বাড়িতে বসবাস করে। সন্তানেরা মায়ের পদবী ধারণ করে। তবে মাতৃপ্রধান হলেও কি হবে পরিবার ও সমাজ পরিচালনায় গারো পুরুষেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
গারো সমাজে একই গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ। গারোদের নিজস্ব ধর্ম রয়েছে। সেই ধর্মের নাম সাংসারেক। তবে আজকাল সিংহভাগ গারো খ্রিষ্টধর্ম পালন করে থাকে। তাদের প্রধান দেবতা ‘তাতারা রাবুগা’। অন্যান্য দেবতাদের মধ্যে গয়রা, মিসি সালজং উল্লেখযোগ্য।
গারোরা বিভিন্ন উৎসব পালন করে থাকে। ‘ওয়ানগালা’ গারোদের প্রধান উৎসব। পুরোহিতকে তারা কামাল বা খামাল বলে।
গারোরা মান্দি বা আচিক ভাষায় কথা বললেও এদের নিজস্ব বর্ণমালা নেই। গারোরা প্রধানত কৃষিজীবী। আগে এরা জুমচাষ করতো। এদের প্রধান খাদ্য ভাত, মাছ, শাকসবজি ও পশুপাখির মাংস। নিজেদের তৈরি এক ধরনের পানীয় গারো সমাজে প্রচলিত। এটাকে চু বলে। এটি গারো সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উপাদান। পুরুষেরা গান্দো, পান্ত্রা, খুতুপ আর মেয়েরা দকমান্দা, দকশাড়ি ইত্যাদি পরিধান করে। গারোদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি রয়েছে।
হাজং
| হাজং সম্প্রদায় |
মঙ্গোলিয় জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত হাজংদের বসবাস প্রধানত শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ি। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট এবং নেত্রকোনা জেলার বিরিশিরি, সুসং দূর্গাপুর ও কলমাকান্দায়। এছাড়াও সিলেট, সুনামগঞ্জেও এদের বসবাস রয়েছে।
হাজংদের আদি নিবাস বার্মায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন আসামের হাজো নামক স্থানে বাস করতো বলে এদের নাম হাজং। হাজং শব্দের অর্থ মাটির পোকা। হাজংদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও কোন বর্ণমালা নেই। এরা অসমিয়া বর্ণমালা ব্যবহার করে। হাজংরা প্রধানত কৃষিজীবী। ভাত মাছ, শাক সবজি ও বিভিন্ন পশুপাখির মাংস এদের প্রিয় খাবার। নিজেদের তৈরি মদও এরা খেয়ে থাকে। মহিলারা নিজেদের তাঁতে তৈরি কাপড়, আর্গন নামের এক প্রকার চাদর এবং পুরুষেরা লুঙ্গি ,ধূতি ও জামা পরিধান করে।
পিতৃপ্রধান হাজং সমাজে ছেলেরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। হাজং সমাজ ৪ ভাগে বিভক্ত।
যথা- পাড়া, গাঁও, চাকলা এবং পুরাগাঁও বা পরগনা। গ্রামপ্রধানকে গাঁওবুড়া এবং চাকলা প্রধানকে গড়ে মোড়ল বলা হয়। এরা ১৭টি গোত্রে বিভক্ত। গোত্রকে এরা নিকনি বলে। হাজং সমাজে একই গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ।
কোচ
![]() |
| কোচ সম্প্রদায় |
বাংলাদেশের প্রাচীন আদিবাসীদের মধ্যে অন্যতম হল কোচ জাতিগোষ্ঠী। কোচদের আদি নিবাস ভারতের কোচ বিহারে। বর্তমানে এদের বসবাস শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী, ঝিনাইগাতি ও নালিতাবাড়ির পাহাড়ি এলাকায়। গত শতাব্দীতে এদের সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমানে এরা সংখ্যায় অনেক কম। কোচরা আটটি দলে বিভক্ত। যথা- হরিগাইয়া, সাতপাড়ি, ওয়ানাং, দশগাইয়া, চাপ্রা, তিনতিকিয়া, শংকর ও মরগান। প্রতিটি দলের আবার একাধিক গোত্র বা নিকিনি রয়েছে। কোচরা পিতৃপ্রধান হলেও সন্তানেরা মায়ের পদবি ধারণ করে। সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় পুত্র সন্তান। একই গোত্রে বিবাহ কোচ সমাজে নিষিদ্ধ। কোচ মেয়েরা বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে চলে যায়।
কোচ পুরুষেরা সাধারণত ধূতি লুঙ্গি ও জামা পরিধান করে। মহিলারা পড়ে নিজেদের তাঁতে তৈরি লেফেন বা লৈফানেক। কোচদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও কোনো বর্ণমালা নেই। নিজের মধ্যে এরা নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করলেও বাংলাতেই বেশি কথা বলে। কোচদের প্রধান খাবার ভাত। এছাড়াও শাকসবজি, ডাল, ডিম, মাছ ও মাংস খেয়ে থাকে। শূকর, খরগোশ, শজারুর মাংস এদের অতি প্রিয়। কুইচা, কচ্ছপসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণির মাংসও এরা খেয়ে থাকে। বিভিন্ন উৎসবে এরা পিঠা, ক্ষীর, পায়েস, মিষ্টি ও নিজেদের তৈরি মদ পান করে থাকে।
Friday, July 17, 2020
বেকারত্ব ও পরিবর্তনীয় ভবিষ্যতের হাতছানি - মিরান।
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
কভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিবে বেকারত্ব। আমেরিকায় প্রায় ৪৩ মিলিয়ন বা ৪ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ তাদের চাকরি হারিয়েছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশেও প্রায় দেড় কোটি মানুষ তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের অনেকেই ইতিমধ্যে বেকার হয়ে পড়েছে। সরকারের নানামুখী প্রণোদনা পাওয়া সত্বেও বিজিএমইএ মোটামুটি বৃহৎ সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। এবং ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূঁজি হ্রাস হবে আরও তীব্র, তাদের অনেকেই পূঁজি হারিয়ে এখন পথে বসে গেছে। তাদেরকে কোনো সরকারি প্রণোদনাতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সম্প্রতি আমেরিকায় 'জর্জ ফ্লয়েড' হত্যার বিচারের দাবীতে বর্ণবাদ বিরোধী চলমান বিক্ষোভের সময়ে অনেক 'শো-রুম' লুটপাটের ঘটনা ছিল চোখে পড়ার মত। এ লুটেরাদের প্রায় সবাই সম্প্রতি চাকরি হারিয়েছেন, এদের অধিকাংশই কৃষ্ণাঙ্গ এবং এ লুটপাট ছিল মূলত একটি প্রতিবাদ। কৃষ্ণাঙ্গরা এ ঘটনার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ ধনীদের একটি বার্তা দিয়েছে যে, আমাদের চাকরি না থাকলে তোমাদেরকেও শান্তিতে থাকতে দিবো না। বলে রাখা ভালো, আমেরিকায় সাম্প্রতিক বেকারত্বের অন্যতম প্রধান স্বীকার কৃষ্ণাঙ্গরাই। হত্যাকান্ডের স্বীকার হওয়া জর্জ ফ্লয়েডও চাকরি হারানোদের একজন।
বাংলাদেশে যদি দেড় কোটি মানুষ নতুন করে বেকার হয়, তাহলে জীবিকা-বঞ্চিত হবে আরও ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষ। কারন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী একজনের আয়ের উপর আরও দুই থেকে তিনজনের জীবিকা নির্ভর করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে পূর্ববর্তী বেকারত্বের সংখ্যা প্রায় ২.৫ কোটি। তার উপর দেশে প্রতিবছর নতুন করে শিক্ষিত বেকার যুক্ত হচ্ছে প্রায় ২০ লক্ষ । আর প্রবাসীদের একটি বড় সংখ্যা যদি বেকার হয়ে দেশে ফিরে আসে, আর যারা দেশে এসে আটকে আছে তারাও যদি চাকরি হারায়, তাহলে বেকারত্ব বাংলাদেশে নানামুখী সমস্যা সৃষ্টি করবে, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
সম্প্রতি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইটালিসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি নাগরিকেরা কভিড নেগেটিভের ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে ভ্রমণ করার পর পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার কারণে সারাবিশ্বে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি শ্রম-আমদানি নির্ভর বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করেছে, শর্ত সাপেক্ষে ভ্রমণের নীতি গ্রহন করেছে। ফলে যেসব প্রবাসি শ্রমিক দেশে আটকে আছে, তাদের কাজে ফিরে যাওয়াটাও পিছিয়ে গেছে, তাদের পরিবারগুলোও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
তেলের দাম 'গ্রেট-ফল' হওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এমনিতেই হুমকির মুখে, তার উপর কুয়েতে বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য (পাপুল) 'এশিয়ার মানব পাচারকারী চক্রের প্রধান হোতা' ও ব্যাপক 'অর্থ পাচারকারী' হিসেবে দেশটিতে আটক রয়েছে। এ ঘটনায় দেশটির একজন জেনারেল, কয়েকজন মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজনকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানিতে কিছু কঠোর নীতিমালা যুক্ত করার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটি। এ ঘটনায় আরব বিশে্ব তোলপাড় শুরু হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে গিয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। লকডাউনের সময়ে বিমানবন্দরগুলোতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও ঋণখেলাপী, ব্যাংক লুটেরা ও অর্থ পাচারকারীদের বিদেশ গমন আমাদেরকে চরমভাবে হতাশ করেছে। ব্যাংকগুলোতে চলছে তারল্য সংকট। চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন করে টাকা ছাপানোর কথাও ভাবছে, ফলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও অমূলক নয়। গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৬০ শতাংশ (প্রকৃতপক্ষে ১০০ শতাংশ)। গত কয়েকবছর ধরে গ্যাস, বিদ্যুৎ, ঘরভাড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবার অনবরত দাম বেড়েছে। ফলে স্থায়ী এবং সাময়িকভাবে বেকার হয়ে যাওয়া পরিবারগুলো কীভাবে চলবে, তার কোনো সমাধান নেই।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা তাদের জীবন-মান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। মধ্যবিত্তরা চলে যাবে নিন্ম-মধ্যবিত্তের কাতারে, নিন্ম-মধ্যবিত্ত হয়ে যাবে নিন্মবিত্ত, নিন্মবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং নিন্মবিত্তদের অনেকেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাতারে নতুন করে যুক্ত হবে। ব্র্যাকের হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের সংখ্যা প্রায় '৬ কোটি'। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক সমস্যাগুলোও ব্যপকভাবে বেড়ে যাবে বলে ধারণা করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। নিন্মবিত্তের যে মানুষেরা কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাত, আয়-রোজগার কমে যাওয়াতে এবং জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়াতে তারা ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা থেকে সরিয়ে আনবে, পরিবারের আর্থিক খরচ বহন করতে তাদেরকে নিন্ম মানের শ্রমবাজারে ঠেলে দিবে, বেড়ে যাবে শিশুশ্রম। ফলে দক্ষতা হারাবে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির বড় একটি অংশ। ফলে, একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়ে যাবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যে তরুণেরা এতদিন শ্রম-বাজারের একটি বড় অংশ ছিল, তারা চাকরি হারিয়ে অর্থের প্রয়োজনে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনের মত অপরাধে জড়িয়ে পড়বে, হতাশায় মাদক গ্রহণ ও পর্যায়ক্রমে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হবে। বেড়ে যাবে ধর্ষণের মত অপরাধও। সংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে সমাজে তাদের প্রভাবও বাড়তে থাকবে, আর এক্ষেত্রে বড় অবদান রাখবে আমাদের সমাজে প্রচলিত তথাকথিত 'বড়ভাই সংস্কৃতি'। উক্ত 'বড়ভাই'দের হাত ধরে তারা ঢুকে যাবে অপরাধ জগতের গভীর সমুদ্রে। প্রভাব বিস্তার করতে থাকবে সমাজে। সাধারণ মানুষদের চলাফেরায় নানামুখী সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে অশিক্ষিত সর্বহারা এ তরুণগুলো। কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হবে শহুরে জীবন। সমস্যা হয়ে উঠবে দীর্ঘ-মেয়াদি।
এদিকে শিক্ষিত-সচেতন মানুষদের মধ্যে বাড়তে থাকবে জন-ক্ষোভ। তারাও বেকারত্বের স্বীকার হচ্ছে, হবে। আয়-উপার্জন কমে গিয়ে, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গিয়ে, তাদের জীবন-মান হবে নিন্মমুখী, সামাজিক ও পারিবারিক জীবন হয়ে উঠবে দুরবিসহ। চাকরি হারিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো থেকে বাসা ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। সাময়িকভাবে আর্থিক অসচ্ছলতা ও ঋণগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়ে যেতে পারে। তারা (শিক্ষিত মধ্যবিত্ত) যেহেতু বিগত সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জ্ঞাত ও সচেতন, ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী করবে। সাথে যোগ হবে সদ্য ঘটে যাওয়া কভিড-১৯ মহামারিতে স্বজন হারানোর ক্ষোভ, যদিও চলমান এ মৃত্যুর মিছিল বা সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনও অনিশ্চিত। সে 'মৃত্যুর স্বীকৃতি' সরকারি হিসাবে পাক বা না-পাক।
আমরা যদি ২০১০ পরবর্তী সময়ে 'আরব বসন্তে'র দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেকারত্ব বেড়ে গিয়েছিল ব্যপক হারে। বেকারত্বই ছিল আরব বসন্তের অন্যতম কারণ। তার সাথে যোগ হয়েছিল পূঁজি লুন্ঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যস্থাপনা, অদক্ষতা, দূর্নীতি, রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটপাট ও অপশাসন। দীর্ঘমেয়াদি পুঞ্জিভূত জনক্ষোভ 'ঘি' ঢেলেছিল উক্ত বিদ্রোহের আগুনে। ফলাফল কী হলো? দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। আর দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা হয়ে উঠল দীর্ঘস্থায়ী। বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তি দেশগুলো নিজেদের ঘরে তুলল সেই 'আরব বসন্তে'র ফসল।
কভিড-১৯ মহামারির কারণে সামনের দিনগুলোতে আরেকটি 'আরব বসন্ত' হাতছানি দিচ্ছে। তবে এবার আরবে নয়, বসন্ত আসবে দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ এবং খোদ উত্তর আমেরিকাতেই। বিশেষ করে যেসব দেশগুলোতে কভিড-১৯ ব্যাপকভাবে ক্ষয়ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার এ সময়ে অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সহযোগিতার পরিধিও কমে আসতে পারে। ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থায়ও। সম্প্রতি ব্রাজিল, মেক্সিকো, ইরাক, জর্ডানসহ বেশ কয়েকটি দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলন লক্ষণীয় যার মূলে রয়েছে বেকারত্ব।
বিশ্বের নামকরা 'নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা' ধারণা করছেন যে, কভিড পরবর্তী বিশ্বে আসন্ন নানামুখী সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না-পেরে বেশ কয়েকটি সরকারের পতন হতে পারে, বিশেষ করে স্বৈরাচারী সরকারগুলো। যে সরকারগুলো প্রথম থেকেই পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরে উদ্ভুত পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেছে, সঠিক তথ্য না-লুকিয়ে জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করেছে, জনগণের মেন্ডেট নিয়ে কাজ করেছে, সে সরকারগুলো সফলতার আলো দেখেছে। আর যে সরকারগুলো স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাজে গেমিংয়ে মেতে ছিল, সব সময়ের মত লুটপাটতন্ত্রের ছিলছিলা জারি রেখেছিল, তথ্য লুকিয়েছে, দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না-করে ধনিক শ্রেণিকে অনৈতিক সুবিধা দিয়েছে, জনগণের সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়নি, সে সরকারগুলো দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে ও হবে। মানুষের আয়-রোজগার না-থাকলে, পেটে ভাত না-পড়লে ঘরে বসে থাকবে না। রাস্তায় নামবে, বিদ্রোহ করবে। স্বৈরাচারী সরকারগুলো পরিস্থিতির গভীরতাকে উপেক্ষা করে উক্ত বিদ্রোহকে কঠোর হাতে দমন করতে চাইবে। রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে একচেটিয়াভাবে প্রশমিত করতে চাইবে সে গণ-উত্তেজনাকে। দেয়ালে পীঠ ঠেকে যাওয়াতে মানুষও এর চুড়ান্ত সমাধান চাইবে। ফলে, ঘটে যাবে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বরং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও নানামুখী মাত্রা যোগ হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, অগণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটপাট, কৃষক-শোষণ, সীমান্ত হত্যা, অর্থপাচার, বিনা চিকিৎসায় স্বজন হারানোর ক্ষোভ ইত্যাদি ঘি ঢালবে উক্ত বিদ্রোহের আগুনে। তাই ধারণা করা যায়, বেকারত্ব আমাদেরকে হাতছানি দিচ্ছে একটি মৌলিক পরিবর্তনের, যা আমাদেরকে অকল্পনীয় একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন করতে পারে।
[১৭.০৬.২০২০]
Wednesday, July 15, 2020
সবকিছু নতুন করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ হতে পারে || মুরশীদ সেলিন।
-লাদাখে ভারত-চীন মুখামুখি।
-পুলিশে সয়লাব হংকং, সেনাদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি।
-যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছল ইরানি ট্যাঙ্কার।
(দৈনিক মানবজমিন - ২৭ মে ২০২০)
বিশ্বের বেশীরভাগ সম্পদ যখন অল্পকিছু ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয় তখন কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই মাসের পর মাস লকডাউন দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে নাগরিকের ভরনপোষন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সে ধনী যুক্তরাষ্ট্র হোক কিংবা হোক সে দরিদ্র বাংলাদেশ। কেননা ব্যক্তির হাতে সম্পদের পূর্ন নিয়ন্ত্রন চলে যাওয়ায় রাষ্ট্রগুলো সেই সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিটি রাষ্ট্রের শ্রমজীবী মানুষদের জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কাজে ফিরে যাবার বিকল্প পথ আপাতত খোলা নেই, যখন দরিদ্ররা রাষ্ট্রকে কর দিতে অক্ষম এবং ধনীরা কর ফাঁকি দিতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছে।
নিওলিবারেলিজম পুজিবাদকে এমন অবয়বে হাজির করেছে, শোষন ও বৈষম্যের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে দেশে দেশে অসন্তোষ যার সাধারন পরিনতি। মানুষের এই ক্ষোভ মোকাবিলায় পুজিবাদের সামনে কর্তৃত্ববাদী পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থান ঘটানো ছাড়া আর বিকল্প ছিলো বলে মনে হয় না। বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করা ছাড়া একবিংশ শতাব্দীর তথ্য প্রবাহের যুগে শোষন চালু রাখা সম্ভব নয় এটা সকলেই বোঝে। ট্রাম্প, মোদী, বলসেনারো, জনসনসহ নাম বলার অযোগ্য এমন অনেক পপুলিস্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছে এরই ধারাবহিকতায়।
কিন্তু এতে যে শেষ রক্ষা হবে না এবং পরিনতি যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে তা অনুমিতই ছিলো। শতাব্দীর ভয়াবহতম বৈশ্বিক মহামারি সেই পরিনতির গতি তরান্বিত করছে হয়তো। এখান থেকে ঘটনা কখন কোনদিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মজার ব্যপার হচ্ছে নিওলিবারেলিজমের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে পপুলিস্ট রাজনীতির বিভ্রম প্রায় সব জায়গায় মধ্যপন্থী ও বামপন্থীদের যথাসম্ভব প্রতিরোধের মুখে পড়েছে এবং এখনো পড়ছে। কেবলমাত্র বাংলাদেশের মধ্য ও বামপন্থীরাই পপুলিজমের পালে হাওয়ার অনুকুলে সজোড়ে বৈঠা ঠেলেছে।
হতে পারে তারা এর বিপদ সম্পর্কে ধারনা করতে পারেনি অথবা তাদের ভিন্ন এজেণ্ডা ছিলো। আপাতদৃষ্টিতে দ্বিতীয়টি হবার সম্ভাবনাই প্রবল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
কিন্তু তাদের এই অবিমৃশ্যতার ফল যা হয়েছে তা হলো রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরকার প্রতিরোধক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, পারস্পরিক বিশ্বাসযাগ্যতা শূন্যের কোটায় নেমে আসা এবং জনগনের মাঝে অপ্রয়োজনীয় অথচ আত্মঘাতী বিভেদের পথ প্রশস্ত হওয়া।
সার্বিক পরিনতিতে বাংলাদেশে লুটপাট ও সম্পদ পাচারের যে কাঠামো গড়ে উঠেছে তা থেকে বেড়িয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেক্ষেত্রে আসন্ন ঝড়ের পর সবকিছু নতুন করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ হতে পারে।
২৮.০৫.২০২০
Tuesday, July 14, 2020
কেমন বাংলাদেশ চাই || মতামত সম্পাদনায় ভূবন মুন্সী।
মন্তব্যকারীদের মতামতের ভিত্তিতে উঠে আসে-
"সমান অধিকার, বাক স্বাধীনতা, মুক্ত ধারার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চা, বেকারত্ব দূর করা, পরমত সহিষ্ণুতা ও দেশজ চেতনায় সংহত হোক রাজনীতি, অবাধ নির্বাচন, সুষ্ঠ রাজনৈতিক পরিবেশ, বৈষম্য মুক্ত বাংলাদেশ, প্রকৃত স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংকট দূরীকরণ, জনসংখা বৃদ্ধির হার কমানো, নিরেপেক্ষ নির্বাচন, সঠিক রাজনীতি ও ঐক্য বদ্ধ জাতি।"
প্রশ্ন ছিলো-
স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে আজ আমাদের সবার
প্রধান চাওয়া কী?
দীর্ঘ পরম্পরার সূত্র ধরে দেশকে আমরা মা, মাতৃভূমি হিসেবেই জানি। তাই দেশ প্রাসঙ্গিক ভাবনা অতীত থেকেই আমাদের মধ্যে তীব্র ভাবে সংহত হয়ে ডালিমের মতো দানা বেধে থাকে সতেজ হয়ে। তবে কখনো কখনো তাতে দেখা গেছে শীত ঋতুর হলদে পাতা। সেই শীত পক্ষ পেরিয়ে আমরা বারেবারেই জানান দিয়েছি আমাদের স্বদম্ভ অস্তিত্ব। যথা সময়ে আপন স্বকীয়তায় হয়েছি যথার্থ। যে কারণে ইতিহাসে এ ভূখন্ড বোগলকপুর বা বিদ্রোহপুর হিসেবে পরিচিতি পায়। বৃটিশরা তাদের রাজধানী কলকাতা হতে দিল্লিতে ট্রান্সফার করে একই কারনে।
৭১ পরবর্তী স্বাধীন দেশে যথাযোগ্য উত্তরসুরীদের হারিয়ে এবং ১৪ই ডিসেম্বরের পরিনতি অর্থে বৌদ্ধিক শূন্যতার পথ ধরে আমরা অনেকটা পথ জানা নাই অবস্থায় আন্দাজে-গোলেমালে কোনরকমে মানচিত্র নিয়ে পথ হেঁটে এতটা দূর এসেছি। বর্তমানে নাকাল অবস্থা চারপাশ থেকে ঝেঁকে বসেছে, এমনকি ঋদ্ধ চেতনার সুঠাম দেহ ধারালো খঞ্জরে কেটেকুটে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। তাই দেশ প্রসঙ্গ আমাদের কাছে আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তারপরও দেশের ভালো মন্দের সাথেই তো আমাদের ভালো-মন্দ থাকার সম্পর্ক। তাই দেরিতে হলেও সে ভাবনা আজ আবার মাথা উচু করে দ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন স্যার একেই বাংলার বেতসীবৃত্তির বৈশিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
মানচিত্রের সাথে যেমন মানুষের ভালো-মন্দ থাকার সম্পর্ক, তেমনি মানচিত্র জেগে থাকে রাজনীতি মারফত। তাই অধিকাংশ মন্তব্যকারীর মতামত রাজনীতি প্রাসঙ্গিক হয়েই উঠে এসেছে। অর্থাৎ বোধের যথার্থ বাটনে চাপ পরেছে, তাই বাক শক্তিতে যথার্থ উচ্চারন এসেছে। আবার দীর্ঘ মেয়াদে দেশকে এগিয়ে নিতে গেলে বর্তমান প্রয়োজনকে সামনে রেখে নয়া আদর্শ অনুযায়ী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অনিবার্য। যার উপস্থিতিতে জনগন ব্যাকরনগত রাজনৈতিক চর্চাতে অভ্যস্থ হবে এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরেই দেশজ চেতনার জন্ম হবে অর্থাৎ যথার্থই বাংলা হয়ে উঠবে বাংলার।
তবে গনতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভোট মারফত পছন্দের সরকার নির্বাচনের প্রসঙ্গটাও অধিক গুরুত্ব দিয়ে উঠে এসেছে। কারন অস্বচ্ছ ভোট রাজনীতির পথ ধরেই দেশটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং পক্ষ-বিপক্ষের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জনগন মানচিত্র সমেত নরকে নিপতিত হয়। এ পথ ধরেই অসৎ আমলা, স্বার্থান্বেষী মহল স্বীয় স্বার্থ হাসিলের প্রশ্নে সরকার হিসেবে মসনদ দখল করে। আপন অযোগ্যতায় দেশকে বিদেশের করতলগত করে আর্থিক ব্যবস্থা সহ আইন-প্রশাসন ব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন করে তুলে। রাষ্ট্রিক যন্ত্রের যথার্থ উন্নয়নতো দূরের কথা, বরং তার কবলে পড়ে ও আপনার অন্ধ মোহে বিষিয়ে দেয় জনযাপন।
পরিশেষে আজ এটা আশা করাই সঙ্গত- আপন মানচিত্রের অক্ষমতা দূর করতে আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ হবো আপনার প্রয়োজনেই। মানচিত্রের সিঁথি থেকে মুছে দিয়ে কলঙ্কের সিঁদুর আমরা সকলেই হয়ে উঠবো নিষ্কলুষ। উত্তর প্রজন্ম যথাযথ সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরেই একদিন বাংলাদেশ কে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়।
সেই দিনের প্রতীক্ষায়...Video
[স্যোসাল মিডিয়া ফেসবুক পোস্ট মারফত মতামত/প্রত্যাশার কন্ঠ শোনা হয়েছিল।]
১৩.১০.২০১৮
Monday, June 29, 2020
কোভিড-১৯ : বাংলাদেশের মার্চ টু জুন - ভূবন মুন্সী।
কে অপেক্ষায় ছিলো এমন পৃথিবীর জন্য! উহান হতে ইতালি, কানাডা হতে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, ভারত কিংবা আরব হতে আফ্রিকা কেউ কী প্রতীক্ষায় ছিলো এমন পৃথিবীর জন্য? কেউ কী জানতো পতিত পল্লী হতে প্রার্থনালয় সব একযোগে বন্ধ হয়ে যাবে একদিন এবং সেটা খুব দ্রুতই। কেউ আন্দাজ করতেই পারেনি নতুন বছর বরণের পরপরই অ্যারাবিয়ান আগাম সংকেতের সেই দাজ্জাল সম বিকট রূপ গ্রাস করবে পৃথিবী; হাসরের মাঠে ছুটতে থাকা শংকিত মানুষের মতোন গোটা দুনিয়ার মানুষ 'ইয়া নাফসি' জপতে থাকবে ঘর দোয়াড় বন্ধ করে ২০২০ খ্রিস্টাব্দের শুরু থেকেই।
যখন শংকা জাগলো
রাত ১:৩৮। ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৯। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে অপরিচিত নিউমোনিয়া শনাক্তের ঘোষণা আসলো একটি সরকারী ওয়েবসাইট থেকে। তখন কেউ কী ভেবেছিলো খুব দ্রুতই ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিংবা কানাডার ফার্স্ট লেডি এ অপরিচিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হবে? কেউ কী ভেবে ছিলো এটা পৃথিবীকে তালাবদ্ধ করবে কয়েক দিনের মধ্যেই? সব কিছু খুব দ্রততায় বদলে গেলো।
রেড এলার্ট : প্যানডেমিক-২০২০
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসের আক্রমণ নিশ্চিত করলেন জানুয়ারিতে। ২১শে জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম করোনা রুগী শনাক্ত হয়। ৩০শে জানুয়ারি WHO করোনাকে Global Health Emergency ঘোষনা করে। চীনের বাইরে ফিলিপাইনে ২রা ফেব্রুয়ারি এক করোনা রুগীর মৃত্যু হয়। ক্রমশ দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে COVID-19 ভাইরাস। বাংলাদেশে তখন রাত সাড়ে দশটা। ১১ই মার্চ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবার করোনাকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করলো। গ্লোবাল প্যানডেমিক!
সাবান বা স্যানিটাইজার এবং মাস্ক ও গ্লাভস
পুরো পৃথিবী একযোগে একই কাজ শুরু করলো। সবাই ঘর বন্ধী হলো। এ রূপ পৃথিবী দেখিনি আর। সবাই মাস্ক পরিধান শুরু করলো। নিয়মিত সাবান, স্যানিটাইজার দিয়ে, হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে করোনা প্রতিরোধ গড়ে তুললো। ভিন্ন কোন সমাধান না থাকায় প্রধান মন্ত্রী থেকে ওয়ার্ড মেম্বার সবাই নির্দেশনায় নামলো। এটা ভালো ছিলো। কিন্তু যখন এটাতেই গোটা বিশ্ব ঘুরতে লাগলো, এটা ছিলো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে দূর্বল দিক।
কোভিড-১৯ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিতঃ
বাংলাদেশে প্রথম করোনা ব্যাধি
মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। বাংলাদেশের আইইডিসিআর এর পরিচালককে এখন সবাই চেনে। তাঁর পোশাক পরিচ্ছদ নিয়েও রুগ্ন সামাজিক মিডিয়া কয়েক দিন ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। ৮ই মার্চ ফ্লোরা ম্যাডাম সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করলেন তিন জন করোনা রুগীর কথা। ইতালি ফেরত দু জন পুরুষ, তাদের আত্মীয় এক নারী। টোলার বাগ, মিরপুর, ঢাকা প্রথম রেড সার্টিফিকেট পেয়ে গেলো। পরে ক্রমশ করোনা গ্রাস করলো সমগ্র দেশ। ১৮ই মার্চ হতে বাংলাদেশেও শুরু হলো মৃত্যুর করুণ সংবাদ। দীর্ঘ হতে থাকলো মৃত্যুর মিছিল।
লকডাউন হয়ে গেলো সাধারণ ছুটি
দেরি হয়ে গেলো। ঘোষণা আসলো ২২শে মার্চ। ২৬শে মার্চ হতে ৪ই এপ্রিল দশ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষনা করা হলো। বিদেশ ফেরৎ মিশে গেছে সমগ্র দেশে। রাস্তায় রাস্তায় রাজধানী ফেরৎ মানুষের ঢল। শঙ্কা এবং আনন্দ উভয়ই চোখে পড়লো রাস্তায়। শঙ্কাটা যেন অস্পষ্ট। লকডাউনের স্থলে সাধারণ ছুটি শঙ্কা ও সচেতনতা দুটোতেই ভাটা নিয়ে আসলো।
নেতা যখন শুধুমাত্র মোটিভেশানাল স্পিকার
মোটিভেশানটা এখন বাংলাদেশে ট্রেন্ড হয়ে গেছে। অসম্ভবকে সম্ভব করতে সবাই ডায়ালগ দিতে প্রস্তুত। করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণদের কথা মোটিভেট এবং হাস্যরস দুটোই দিয়েছে। কখনো কখনো অতি বাড়তি বক্তব্য বা তেলবাজি মূর্খামির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সাধারণ একটা অংশ পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ও অবশ্য পালনীয় ডেলিভারিটাও অবজ্ঞায় উড়িয়ে দিয়েছে। ফল ফলেছে আরও মারাত্মক।
ধান কাটা, ফটোসেশান ও আজাইরা কাজী
বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব মতে এখনো বাংলাদেশের ৮৭℅ গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি। বৈশ্বিক ভাবেও কৃষিতে বাংলাদেশ অবদান রাখছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জানুয়ারি ২০২০ খ্রিস্টাব্দের তথ্যমতে বিশ্বে সবজি, ধান ও আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ৩য়, ৪র্থ এবং সপ্তম। কিন্তু কৃষক ও কৃষিতে রাষ্ট্রীয় হাত যেন অনেকটা অচ্ছুৎ কিংবা প্রদর্শনী মূলক। এ বোরো মৌসুমে সকলের ধান কাটার জন্য কৃষকের ক্ষেতে নামা যেন প্রদর্শনী উৎসবে পরিণত হয়। ধান হাতে ফটোসেশানের হিড়িক পড়ে। ফাঁকটা সবাই জানে। অভিনয়টাও বুঝে। প্রযুক্তিকে দূরে রেখে উপর উপর একদিনের আদর। যদিও ক্রিকেট গর্ব, বর্তমান সাংসদ মাশরাফি বিন মর্তুজা ধান কাটার প্রযুক্তি সরবরাহ করে সোশাল মিডিয়ায় নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। এই সংবাদের ভাইরাল অপর সাংসদের কৃষক উন্নয়নের খরাকে প্রকাশ করে। চলতি বাজেটেও ধান ক্রয় বিক্রয়, কৃষি ঋণ, বীজ বিতরণ, উন্নত কৃষি পরিকল্পনা অনাদরে থেকেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
হাসপাতাল, নার্স ও ডাক্তার
করোনা স্বাস্থ্য সংকট। এ সংকটে প্রত্যক্ষ সৈনিক ডাক্তার ও নার্স। ক্যাম্প হলো হাসপাতাল। যুদ্ধে সৈনিকদের অস্ত্র না থাকা যেমন শংকার, তেমনি এ ভাইরাস সংকটে পিপিই'র অপ্রতুলতাও গভীর শংকার। করোনা দেশের স্বাস্থ্য খাতের দূর্বলতা ওপেন করেছে এবং এটা বিশ্বের সকল দেশের স্বাস্থ্য সক্ষমতা ওপেন করেছে। মাস্ক সংকট, ভেন্টিলেটরের অভাব, আইসোলেশন সংকট গভীর ভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। সর্বোপরি স্যালুট সকল ডাক্তার ও নার্সদের। গণস্বাস্থ্যের ভূমিকাও প্রশংসনীয়। বিপরীতে কিট অনুমোদন বা প্রয়োগ পরীক্ষায় ঢিলেমি ভাব স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র জনদের অতি নীচু মানসিকতাকে প্রকাশ করে।
মানবতা এবং আসুরিকতা
সংকট এলেই উন্মোচিত হয় চারিত্রিক বাইবেল। করোনা সংকটে সামাজিক ফ্রন্টের সহযোগিতার স্বতঃস্ফুর্ত উদ্যোগ মানবিকতার জয় গান ঘোষণা করে। ব্যক্তি বা সংগঠনগত সহযোগিতার হাত ছিলো লক্ষনীয়। বিপরীতে সরকারী ত্রাণ চুরির ঘটনা ছিলো ব্যাপক ভাবে জন ধিক্কৃত।
করোনা রোগী এবং অমানবিক আচরণ
কোভিড-১৯ ভইরাস অতিমাত্রায় সংক্রমিত রোগ। মানুষ হতে মানুষে দ্রুত এবং সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক। রুগীর সাথে অমানবিক আচরণ কোন পরিস্থিতিতেই কাম্য নয়। কিন্তু ঘটেছে এসব। অতি অমানবিক কিছু ঘটনা। খুবই লোমহর্ষক। অসুস্থ মা, বাবা, স্বামী কিংবা সম্তানকে ফেলে দেওয়ার, রেখে চলে যাওয়ার মতোন ঘটনা। এটা আমাদের রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও ব্যাধি সংক্রান্ত অজ্ঞাতার বহিঃপ্রকাশ। হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যদিও হাইকোর্ট এ সমস্ত কার্যকলাপকে ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে রায় দিয়েছে।
অমীমাংসিত এবং অচল শিক্ষা খাত
১৬ই মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হয়। আজ অবধিও বন্ধ আছে। এরকম বৈশ্বিক এবং সংক্রামক সংকটে এটাই স্বাভাবিক। শৈশবেই, কৈশোরেই ফুসফুসে ভাইরাসের তান্ডব থাবা অভিভাবক হিসেবে আমিও মানতে পারিনা। রাষ্ট্রও পারেনি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে যথার্থ কাজ করেছে। রাষ্ট্র সচেতন ভূমিকা নিয়ে সংসদ টিভিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকদের জন্য ক্লাস সম্প্রচার করছে। ৭ই এপ্রিল হতে প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য চালু করেছে 'ঘরে বসে শিখি' কার্যক্রম। এ কার্যক্রম সরকারকে সচেতন প্রয়াসে রোড পর্যন্ত নিশ্চিত করা উচিৎ এবং প্রাইভেট বিদ্যালয় সমূহের কার্যক্রম টোটালি বন্ধ আছে, এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিৎ।
ঈদ আনন্দ এবং ভাইরাসের বিস্তার
২৬শে মার্চে শুরু হওয়া সাধারন ছুটি ৭বার বর্ধিত হয়ে চলে আসে ৩০শে মে পর্যন্ত। এর মধ্যে ২৪-২৬শে মে ছিলো ঈদুল ফিতরের ছুটি। পৃথিবী সুদ্ধ ধর্মীয় আচার ও উৎসব অনেক পূর্ব হতেই সংকোচিত ছিলো। বাংলাদেশেও ছিলো। ছিলো মুক্ত চলাচলের বাঁধা। সন্ধ্যা ৬টা হতে ভোর ৬টা পর্যন্ত বাসা থেকে বের না হবার প্রজ্ঞাপন। ঈদ সামনে রেখে শিথিলতা নিয়ে আসা হয়। শুরুর দিককার বক্তব্য, আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী কিংবা লকডাউন নয়, সাধারণ ছুটিতে বেড়াতে আসা জনগন এখনো সিরিয়াস নয় সরকারী নির্দেশনায়। ঈদ মার্কেটে জনভিড় আরও বাড়িয়ে দেয় করোনার বিস্তার।
কুয়াশার চাদরে ঢাকা পুরনো অসুর
করোনায় তটস্থ গোটা বিশ্ব। ইতালি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইরানে নাকানিচুবানি। চিকিৎসা সংকট ও চিকিৎসায় অবহেলা দুটোই মিটআপ করা হচ্ছে দেশে দেশে। এর মধ্যে ধর্ষণ, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই যেন কমে গেলো। ব্যাপারটা ছিলো আশার এবং ভালো লাগার। কিন্তু না, তা নয়। কুয়াশার চাদর ভেদ করে চোখে পড়ে পুরনো অসুর। সবাই যেন থমকে যায়। আসুরিক ভীবৎষতা দেখে।
ভাষাগত সংকট: জনগণ, রাষ্ট্র এবং মিডিয়া
লকডাউনের সময় ছিলো সেটা। ২৬শে মার্চ ঘোষনা করা হলো সাধারন ছুটি। রাষ্ট্রের তৎপরতা লকডাউনের অনুরূপ। শব্দগত প্রয়োগে এটা রাষ্ট্রের ভুল। আইসোলেশন, লকডাউন যতোদিন পর বোধগম্য হলো, ততোদিনে কেল্লাফতে, মানে সব শেষ। দেশটার সব জেলা করোনার আশ্রম। সামাজিক দূরত্ব এবং শারীরিক দূরত্বকে এক রূপেই প্রচর হচ্ছে শুরু থেকেই। সামাজিক দূরত্ব কোন পরিস্থিতিতেই কাম্য নয়। আর এটা বোধগম্য করার প্রচেষ্টা মিডিয়া কিংবা রাষ্ট্র কারও ছিলো না, এখনো নেই আর নেই বলেই রোগীকে রাস্তায় ফেলে দেবার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে স্বয়ং রাষ্ট্র এবং মিডিয়া। সোসিয়াল ডিসট্যান্স শব্দটা বৈশ্বিক ভাবেই ভাষাগত সংকটকে প্রকাশ করেছে।
মরার উপর খাড়ার ঘা
সকল মহামারীতে জন জীবনের সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকে। চীনের সেই কোভিড-১৯ সমগ্র বিশ্বে কামড় দিয়েছে ইতোমধ্যে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে দেশে দেশে। বাংলাদেশেও সে বৈরী হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছে। যা ভাবছিলাম প্রথম থেকে তাই হলো। এটা ঘটে গেলো আমার শোবার ঘরে। পরদিন সকালে খোঁজ নিয়ে দেখি প্রতিবেশীর আরও তিন ঘরে এবং আমার মামার ঘরে ঘটেছে। জুন মাসের শেষ দিন। আজ মঙ্গলবার। জানা গেলো সেইম ঘটেছে আশপাশের কয়েকটি ঘরে। তারমানে চুরি, ডাকাতি, লুটপাট বৃদ্ধি পেয়ে গেছে ইতোমধ্যে। আর্থিক সংকটের যোগ্য মীমাংসা না আসলে এভাবেই সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকবে। এই সমস্ত পুকুর চুরি, নাস্তা বিল বিশ কোটি টাকা ইত্যাদি ঘটনা সংকট কালে সামাজিক অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে, আরও দেবে। ভোগান্তি আপ টু বটম সকলেরই বাড়ছে।
ময়ূর এসে ধাক্কা দিলো মর্নিং বার্ডকে
মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। লঞ্চ দূর্ঘটনায় ত্রিশোর্ধ মৃত্যু। সুসময় কখোন আসবে! কখোন ফিরবে! ফিরবেনা?তের ঘন্টা পর পানির তলদেশ হতে জীবীত এক জন উদ্ধার। সুসময় ফিরে আসার সংবাদ গুলো এরকমই হয়। সহস্র মৃত্যুর ভিড়েও স্বপ্ন দেখায়। বুকে জাগায় আগামীর স্বপ্ন দেখার সাহস।
সুসময়ের অপেক্ষায় পৃথিবী
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরদেন নিজের ড্রয়িংরুমে মেয়েকে নিয়ে আনন্দে নাচতে থাকেন, সগর্বে জানান- আমরা করে দেখিয়েছি। সুসময় ফিরে আসার সংবাদ এরকমই হয়। নিউজিল্যান্ড প্রথম করোনা মুক্ত দেশ। খুব দ্রুতই, হ্যাঁ, এটা সম্ভবত খুব দ্রুতই ঘটবে, যেদিন আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে নাচবো। বলবো- ইয়েস, উই ক্যান। হ্যাঁ। হ্যাঁ, আমরা পারি। করোনা মুক্ত বাংলাদেশ, করোনা মুক্ত পৃথিবী- এই তো।
৩০শে জুন, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ।
Wednesday, June 3, 2020
পরীক্ষায় ফেল অথবা আত্মহত্যা অথবা খুন হয়ে যাওয়া সম্ভাবনা সমূহ - মোঃ শামীম রেজা
এস এস সি বা এইচ এস সি বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর যখন পত্রিকাতে শিরোনাম দেখি কোমলমতি বাচ্চাদের আত্মহত্যার এবং একই সাথে নাম করা স্কুল ও সেরা কিছু শিক্ষার্থীদের ছবি ছাপা - দুটো খবরই আমার কাছে সমানভাবে দুঃখজনক এবং অশ্লীল। প্রথম ঘটনাটার জন্য সামষ্টিকভাবে দ্বিতীয় ঘটনাটার কোন না কোন ভাবে দায় আছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কি? কেন ছেলে মেয়েদের কে শিক্ষিত করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়?
একসময় বলা হতো মানুষের মত মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষার প্রয়োজনে ছেলেমেয়েদেরকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়।
আজ স্কুল -কলেজের গন্ডিতে যাওয়ার পর তারা প্রথম যে বিষয়টা জানতে পারে তা হলো তাকে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করা হয়েছে এবং তাকে সর্বোচ্চ জায়গাটাতে যেতে হবে নইলে তার পরিবারের এবং তার নিজের জীবন ব্যর্থ। এই যে মূল্যবোধ তার বীজ বপন করে দেওয়া হলো পরিবার এবং প্রতিষ্ঠান থেকে। এই বোধের সুদুরপ্রসারী ফল ফলতে থাকে সমাজ-রাষ্ট্র -পরিবারে।
কিভাবে?
এই শিক্ষার ফলে তার ভিতরে গড়ে ওঠে আমি আমি ভাব। জীবনের সর্বক্ষেত্র জুড়ে এই ভাবের চাষ হতে থাকে। কিছু ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। সফলতার ব্যর্থতার মানদন্ড তাকে নিয়ে যায় এক নিরন্তর আমিময় আকাঙ্খার ভিতর যেখানে সামাজিক দায়বোধ থাকে না, রাষ্ট্রিক দায়বোধ থাকে না, এমনকি একসময় দেখা যাবে সে বৃদ্ধাশ্রমের মত দায়হীন অমানবিক ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করছে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে গুরু দ্রোণের পিতৃস্নেহের দুর্বলতা এবং পুত্রের সুখ ভাবনা থেকে যে ভুল শিক্ষা অশ্বথামা পেয়েছিল সেই শিক্ষা পরবর্তীতে পুত্রকে পিতার অবাধ্য হওয়ার ইন্ধন যুগিয়েছিল। অপরপক্ষে নিজেদের শিক্ষা গুরু শত্রু পক্ষে থাকা স্বত্ত্বেও পান্ডুপুত্রগণ শিক্ষা গুরুর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেছে সবসময়।
এর কারণ কি?
কারণটা হলো পান্ডবপুত্রগণ মনে করেছে যে, এটা ন্যায়ের যুদ্ধ ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থাৎ সামষ্টিক কল্যাণের জন্য এই যুদ্ধের প্রয়োজন হচ্ছে। এখানে সামষ্টিক বোধ হলো মূখ্য বিষয়।
এ কালের শিক্ষা ব্যবস্থা তো কোমলমতি শিশুদের যন্ত্র ছাড়া আর কিছু বানাতে পারছে না, সামষ্টিক বোধ নির্মাণ তো দুরাশা। আমাদের দেশে তো এখন দু-তিন বছরের শিশুকে যন্ত্র বানানোর কারখানায় নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছে।
এই সময় থেকেই তার ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সে একা এবং জগত সংসারে তাকে সফল হতে হলে ভালো ফলাফল করে অমুক-তমুক হতে হবে। এর বাইরে যে বিশ্বপ্রকৃতি আছে, সমাজ আছে, রাষ্ট্র আছে, মানবিকতা আছে, সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের প্রতি যে তার একটু হলেও দায়বোধ আছে তার কোন শিক্ষাই তো সে পায় না। এক সময় নিজের ভিতর আটকে গিয়ে এতোটাই ইগো, আত্মকেন্দ্রীকতায় ডুবে যেতে হয় - বাবা মায়ের সাথেও হিসেবী হয়ে উঠতে হয় তাকে।
বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইউরোপীয় আলোকায়ন প্রাপ্তীর এই হলো সমাজতাত্ত্বিক ফল। এর বাইরে যে অংশটা আছে তারা তো দেশের বাইরে উড়াল দেয় আর একেবারে প্রান্তিক তাদের খাবি খাওয়া শিক্ষা দিয়ে কোনরকম উঠতি কলকারখানা গুলোয় শ্রমের যোগান দেয়।
শিশু বয়স থেকেই যে মানদন্ড একজন শিশুর মূল্যবোধে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তখন সেটাই তার জীবনের সারৎসার হয়ে দাড়ায়। সেখানে ব্যর্থ হলে জীবনের আর কোন মানে থাকে কি?
এর বাইরে যে অংশটা থেকে যেতে চায় বা এই ব্যবস্থাকে মানতে চায় না, তারা নেশাগ্রস্ত অথবা উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের স্বীকার হয়। যার কোনটার জন্যই সে কোনভাবেই দায়ী নয়।
বড় মানুষ হওয়া বলতে পেশাভিত্তিকতার যে দাওয়া দেওয়া হয় তার ফল সফলতায় এবং বিফলতায় উভয়টাতেই সমাজ রাষ্ট্রের জন্য অস্বাস্থ্যকর।
বড় মানুষ মানে বড় চৈতন্যজগতের অধিকারী মানুষ। যে চেতনায় মানবিকতা-মনুষ্যত্ব বোধের শিক্ষা আসে না, সেখানে জীবনকে অতি তুচ্ছ কারণে যেমন খুব বড় বা আরামদায়ক মনে হতে সময় লাগে না আবার অতি তুচ্ছ কারণে খুব ছোট বা যন্ত্রনাদায়ক মনে হতেও সময় লাগে না।
বিগত দশ বছরে ভালো রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু বিগত দশ বছরে সামাজিক -রাজনৈতিক মান কোন দিকে ধাবিত হয়েছে?
যেসব শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করে কিংবা করছে তারা কি এই শিক্ষা-সমাজ মূল্যবোধের বলি হলো না?
অনেকেই বলছেন টলছেন যে, ছেলেমেয়েদেরকে সময় দিন, তাদেরকে খেলাধুলা করতে দিন। সময় দেওয়া বা খেলাধুলা করতে দেওয়ার বিষয়! ভাবুন অভিভাবক হিসেবে আজকের বাবা মা-শিক্ষকদের অবস্থাটা কোন স্তরে যে একজন শিশু তার বাবা-মা'র কাছ থেকে সময় পাওয়া উচিত, তার খেলাধুলা করা উচিত, এটা জানার জন্য বা বোঝার জন্য মনরোগ বিশেজ্ঞদের কাছে যাওয়া লাগছে!
আসলে মন বিকল কাদের হয়েছে?
কিন্তু এমনটা কেউ তো বলছেন না যে সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি তার দায় আছে এবং সেই দায়ে দীপ্ত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে সাথে মানবিকতা অর্জন করতে হবে। যে যে বিষয়ে তার আগ্রহ হয় সে বিষয় নিয়েই সে পড়ালেখা করুক মানুষকে ভালোবেসে। তো সে ভালো ফলাফল করে বড় চাকরি করে ঘুষ খাবে না, দুর্নীতি করবে না তো কি আঙুল চুষবে? আর সেখানে যদি এস এস সি বা এইচ এস সি তে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায় পরিবার এবং সামাজিক স্ট্যাটাস অনুযায়ী তখন আত্মহত্যায় তো তার মুক্তির পথ, নাকি!
সর্বোপরি একটা কথা বলে শেষ করতে চাই
কুয়োতে যা থাকে বালতিতে তাই উঠে আসে।
কি শিখছে আজকের ছেলেমেয়েরা তা অবশ্যই অনুসন্ধান করতে হবে, তার আগে তাদেরকে পরিষ্কার করতে হবে কেন শিখবে তারা। নইলে আগামীতে আরো বিকৃত এবং অমানবিক অনেক কিছু দেখার জন্য প্রস্তত থাকতে হবে।
হয়তো এই সব ঝরে পড়া বা সমাজ ভাষায় নষ্ট হয়ে যাওয়া ছেলেমেয়ে গুলোই বিপুল সম্ভাবনাময় ছিল তাদের ক্ষেত্রজুড়ে। উপযোগী পরিচর্যা এবং প্রকাশের মাটি না পাওয়ায় তারা বিকশিত হতে পারেনি।
বিঃদ্রঃ অমুক রিকশা চালকের ছেলে, তমুক দিন মজুরের মেয়ে একবেলা দুবেলা খেয়ে এরাম ওরাম রেজাল্ট করছে এগুলো এভাবে ছাপতে আপনাদের রুচিতে বাধে না?
০৩.০৬.২০২০






